সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.13]

#Ch.50

আবিরকে, রাকিব আর রাসেল মিলে কলের পর কল দিচ্ছে কিন্তু আবির একবারের জন্যও কল ধরছে না। প্রথম দিকে আবিরের ফোনে কল ঢুকলেও কিছুক্ষণ পরই আবির ফোন বন্ধ করে ফেলেছে। মিষ্টি, সাদিয়া আর লিজা একে অপরের দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে। বন্যা বিড়বিড় করে বলল,

" তোদের সাবধান করেছিলাম, একবারের জন্যও কথা শুনলি না। "

ওরা একসঙ্গে বলল,

"সরি দোস্ত। "

রাকিব, মিনহাজ আর তামিমের দিকে তাকিয়েই দেখছে না। পাবলিক প্লেসে মারছিল বলে বাধ্য হয় তানভিরকে তখন আঁটকিয়েছিল রাকিব। না হয় তানভিরের সাথে সাথে রাকিবও দুটাকে পিটাইতো।ওদের প্রতি প্রায় ৫ মাসের ক্ষোভ জমে আছে রাকিবের মনে । রাকিবের কলিজার বন্ধু আবির, আবিরের সবকিছুতে রাকিব যেমন সবার আগে এগিয়ে আসে তেমনি আবিরও তাই। ছোট বেলা থেকেই ওদের ফ্রেন্ডশিপ অনেক স্ট্রং। সচরাচর দেখা যায় এক বন্ধু ঝগড়া লাগলে আরেক বন্ধু থামায় অথচ ওদের মধ্যে এমন সম্পর্ক যে একজন ঝগড়া লাগলে আরেকজন সঙ্গ দেয়। দুজন মিলে ঐ ছেলেকে মারে। কলেজ জীবনে রাকিব টুকিটাকি রাজনীতি করতো, কিন্তু আবিরের সেসবে কোনো ইন্টারেস্ট ছিল না। তবে রাকিবের সাথে যে ই লাগতে আসতো দুই বন্ধু মিলে ঐটার অবস্থা খারাপ করে ফেলতো। পরবর্তীতে কলেজের পরীক্ষায় রাকিবের রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় আবির বুঝিয়ে শুনিয়ে রাকিবকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে এনেছিল৷ এখনও কলেজের অনেক বন্ধুরা রাকিবকে লিডার বলে ডাকে। রাকিব আবিরকে কল দিয়েই যাচ্ছে, এই সুযোগে রাসেল চোখের ইশারায় মিনহাজ আর তামিমকে চলে যেতে বলল। কারণ তানভির যদি বাই চান্স আবার এখানে আসে আর মিনহাজদের সামনে পায় তাহলে এবার আর ওদের বাঁচানো যাবে না। তামিম মিনহাজকে নিয়ে চলে গেছে। রাকিব কিছুক্ষণ পর বিষয়টা খেয়াল করেছে তবুও রাসেলকে কিছু বলে নি। রাকিবের সব টেনশন এখন আবিরকে নিয়ে। শহরের আশেপাশে যত বন্ধু আছে একে একে সবাইকে কল দিয়ে জানিয়েছে। যাদের বাইক আছে তারা বাইক নিয়ে বেরিয়ে পরেছে। রাকিব এগিয়ে গিয়ে একটা রিক্সা ঠিক করে বন্যাকে বললো,

"তুমি বাসায় চলে যাও"

বন্যা "আচ্ছা" বলে চলে গেছে। রাকিব বাকিদের উদ্দেশ্যে রেগে বলল,

"তোমরা যাও এখন"

রাকিবের রাগী স্বর শুনে ওরাও মাথা নিচু করে চলে গেছে। পরিস্থিতি অস্বাভাবিক দেখে রাসেলের গার্লফ্রেন্ড চলে গেছে৷ রাকিব রাসেলকে নিয়ে বাইক স্টার্ট দিল। তানভির মেঘকে বাসার সামনে নামিয়ে দিয়েই চলে গেছে, একটা কথাও বলে নি। রাকিবরা প্রায় ১ ঘন্টা যাবৎ আনাচে কানাচে ঘুরছে অথচ আবির একেবারে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। কেউ আবিরের কোনো খোঁজ পাচ্ছে না।

বন্যা বাসায় গিয়েই মেঘকে কল দিল। মেঘ রিসিভ করতেই বলল,

"কিরে তুই ঠিক আছিস?"

মেঘ মৃদুস্বরে বলল,

"আমি ঠিক আছি কিন্তু আবির ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। "

"তুই আবির ভাইয়া কে কল দে"

"আমার ভয় লাগতেছে।"

"এখন ভয় লাগে কেন? এতদিন বারণ করার পরও তো একটু ভয় লাগলো না"

"আমি এখন কি করবো?"

" আবির ভাইয়াকে কল দে আর কিছু করতে হবে না। "

" ওনি কি কল ধরবেন?"

"ধরবেন কি না সেটা দিলেই বুঝবি। তুই ওনাকে রাগাইছিস তোকেই শান্ত করতে হবে। "

"আমি পারবো না। ভয় লাগতেছে। "

"আর একটা কথা বললে তোর খবর আছে বলে দিলাম। মিনহাজ, মিষ্টিদের কথায় লাফানির সময় ভয় ডর কোথায় ছিল তোর?"

"আচ্ছা দিচ্ছি কল।"

বন্যার কল কেটেই মেঘ আবিরের নাম্বার বের করল। ভয়ে বুক কাঁপছে অবিরাম। ৫ মিনিট অপেক্ষার পর বুকে সাহস নিয়ে আবিরের নাম্বারে ডায়াল করল। আবিরের ফোন বন্ধ পেয়ে আঁতকে উঠলো মেঘ। বার বার কল দিতে লাগলো। ভয় আর দুশ্চিন্তা তিনগুণ বেড়ে গেছে। রাকিব, রাসেল, তানভির এদিকে মেঘ সবার একাধারে কল দেয়ার কারণে একবার নেটওয়ার্ক বিজি বলছে আবার বন্ধ বলছে। মেঘ আজ পর্যন্ত যতবার আবিরকে কল দিয়েছে কোনো সময় ফোন বন্ধ পায় নি আজই প্রথম আবিরের ফোন বন্ধ। মেঘ রাগের চোটে কান্না শুরু করে দিয়েছে। প্রায় ১৫ মিনিট একের পর এক কল করতে করতে অবশেষে একটু থামলো। ভয়ে ভয়ে কল করলো তানভিরকে। তানভির কল রিসিভ করতেই মেঘ উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,

" আবির ভাইয়ের কোনো খোঁজ পেয়েছো ভাইয়া?"

তানভির ঢোক গিলে নিজেকে ধাতস্থ করে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

" না, বাসায় আপাতত কিছু বলিস না।"

"আচ্ছা"

তানভির কল কেটে দিয়েছে। মেঘের টেনশনে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে অথচ এখনও আবিরের কোনো খবর নেই৷ আজ বাসায় তেমন মানুষও নেই। মীমের নানু খুব অসুস্থ তাই মীমরা দুদিন হলো ওদের নানুবাড়িতে গেছে। ইকবাল খান মীমদের নিয়ে গেছেন এখনও বাসায় আসেন নি। হালিমা খান আর মালিহা খান বাসায় আছেন। আলী আহমদ খান অফিসে। মোজাম্মেল খান আজ সকালেই রাজশাহী গেছেন। মেঘ উপুড় হয়ে শুয়ে ফোনে আবিরের ছবি দেখছে আর অঝোরে কাঁদছে। মেঘের বর্তমান বয়সটায় দোষের৷ এই বয়সে এমন ঘটনা ঘটানো অস্বাভাবিক কিছু না। আবির ভাইয়ের প্রতি বেধক আবেগ, ভালোবাসি শুনার তীব্র আকাঙ্খায় যে যা বলেছে সব শুনেছে। নিজের করা ভুলের জন্য এখন খুব প্রস্তাচ্ছে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হতে চললো কিন্তু আবিরের কোনো হদিস নেই। আলী আহমদ খান ৭ টার দিকে বাসায় ফিরেছেন। আলী আহমদ খান নিজেও আবিরকে ২-৩ বার কল দিয়েছেন। আবিরের ফোন বন্ধ পেয়ে বাসায় এসে মালিহা খানকে শুধালেন,

"আবির কি বাসায় আসছে?"

"এখনও আসে নি "

"ওর ফোন বন্ধ কেন? তোমার সাথে কথা হয়েছে?"

"নাহ। হয়তো ফোনের চার্জ শেষ। তুমি দুশ্চিন্তা করো না"

আলী আহমদ খান অল্প নাস্তা করে শুয়ে পরেছেন। একটু পর মেঘের ফোনে আননোন নাম্বার থেকে কল আসলো। প্রথম বার রিসিভ করল না। দ্বিতীয় বার রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রাকিব আতঙ্কিত কন্ঠে প্রশ্ন করল,

"আবির, কোথায় তুই?"

মেঘ স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

" আমি মেঘ৷ "

"মেঘ আমি তোমার রাকিব ভাইয়া"

"জ্বি ভাইয়া, চিনতে পারছি। "

রাকিব কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে জিজ্ঞেস করল,

"আবির কি বাসায় গেছে?"

মেঘ আকুল স্বরে বলল,

"এখনও আসে নি। ওনি কোথায় আছে ভাইয়া?"

রাকিব তটস্থ হয়ে বলল,

" আবির বাসায় যায় নি? তাহলে এই নাম্বার? "

'এটা আমার নাম্বার। ভাইয়া সীমটা আমায় দিয়েছিল "

রাকিব শান্ত স্বরে বলল,

"ওহ আমি জানতাম না, সরি। আসলে এই সীম টা আগে আবির ইউজ করতো। দেশের বাহিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এটায় ওর নাম্বার ছিল। পরে নতুন সীম নিয়েছে। এত বছর যাবৎ নতুন সীম গুলোতেই যোগাযোগ করে আসছি। আজ ওর ফোন বন্ধ পেয়ে অনেক খোঁজে এই নাম্বার টা পেয়েছি৷ এই সীম তাহলে তোমায় দিয়ে দিছে!"

মেঘের মাথায় এবার আকাশ ভেঙে পরেছে। প্রায় ২-৩ বছর যাবৎ মেঘ এই সীম ইউজ করছে। ভেবেছে তানভিরের সীম তাই তেমন মাথাও ঘামায় নি। অথচ এই সীম আবির ভাইয়ের। এক মুহূর্তেই মেঘের চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সামান্য ভালোবাসার কথা শুনার জন্য মেঘ এতটা উতলা হয়ে ছিল অথচ মেঘের সবকিছু জুড়েই আবিরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে৷ আবির ভাই তাকে সবদিক থেকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে৷ মেঘ করুণ স্বরে বলল,

"ওনার খোঁজ পেলে আমায় জানাবেন, প্লিজ। "

"অবশ্যই। রাখছি "

রাকিব কল কেটে দিতেই মেঘ ফোন বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। নিজের উপর এত রাগ হচ্ছে যে কি করতে কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। ফ্লোরে বসে দু'হাতে নিজের চুল মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে অপরিচ্ছিন্নভাবে কেঁদেই চলেছে।

রাত প্রায় ৯ টার পর তানভির হঠাৎ হালিমা খানকে কল দিল। তানভিরের কথা শুনে হালিমা খান আর্তনাদ করে উঠলেন। তানভির কল কাটতেই হালিমা খান ছুটে গেলেন মালিহা খানের কাছে, মেঘকে অবিরত ডাকতে লাগলেন। মেঘ চোখ মুছে বেলকনিতে আসতেই দেখল বড় আব্বু, বড় আম্মু বাসা থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছেন। হালিমা খান উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললেন,

"মেঘ তাড়াতাড়ি আয়, আমাদের বের হতে হবে।"

"কোথায়?"

"তুই আয় আগে।"

মেঘ চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

"রেডি হতে হবে না? "

"না। যেভাবে আছিস সেভাবেই চল।"

মেঘ দ্রুত নেমে আসলো। হালিমা খান বাসা তালা দিয়ে গাড়িতে বসলেন। মালিহা খান শীতল কণ্ঠে শুধালো,

"কে অসুস্থ? বললে না তো!"

মেঘ বুকটা ছ্যাত করে উঠল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিচ্ছে। ফোন টাও বাসায় ফেলে আসছে। আবির ভাইয়ের খোঁজ পায় নি এখনও। মেঘের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। কথা বের হচ্ছে না গলা দিয়ে। হালিমা খান স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,

" হাসপাতালে গিয়ে দেখি। "

মালিহা খান আর্তনাদ করে উঠলেন,

"আমাদের কারো কিছু হয়েছে?"

হালিমা খান তানভিরকে কল দিয়ে হাসপাতালের ডিটেইলস নিয়েছে। মালিহা খানের কথার কোনো উত্তর দেন নি। জ্যাম পেরিয়ে হাসপাতালে আসতে আসতে ১০ টার উপরে বেজে গেছে। হাসপাতালের সামনেই রাকিব দাঁড়ানো ছিল৷ সবাই নামতেই রাকিব রাস্তা দেখিয়ে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। মেঘ হাঁটছে ঠিকই তবে হাঁটায় কোনো গতি নেই। অক্লিষ্ট আঁখিতে মেঘ রাকিব ভাইয়াকে দেখছে। রাকিবের শার্টে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ লেগে আছে। দেখে বুঝা যাচ্ছে শার্ট টা ভেজা। মেঘের পা চলছে না, ভয়ে হাত-পা কাঁপছে। মাথা ঘুরছে, চোখে ঝাপসা দেখছে। কোনোরকমে ওদের পেছন পেছন একটা রুমের দরজা পর্যন্ত এসেই সবাই থমকে দাঁড়ালো। প্রাইভেট ক্লিনিকের একটা ছিমছাম রুমের বেডে বেহুঁশ অবস্থায় শুয়ে আছে আবির। মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ, ডান হাতে, ডানপায়ে ব্যান্ডেজ করা। আবিরকে এ অবস্থায় দেখে ছুটে গিয়ে মালিহা খান আবিরকে ধরে বিলাপ শুরু করে দিয়েছেন। আলী আহমদ খান করুণ দৃষ্টিতে ছেলেকে কিছুক্ষণ দেখে আশপাশে নজর দিলেন৷ তারপর ভারী কন্ঠে রাকিবকে শুধালেন,

"কি হয়ছিল?"

"বাইক এক্সিডেন্ট করেছে।"

আলী আহমদ খান সঙ্গে সঙ্গে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,

" বাইক কিনার সময় ই বলছিলাম, এক বারের জন্যও আমার কথা মানলো না। "

আলী আহমদ খান আবারও হুঙ্কার দিয়ে উঠল,

"তানভির কোথায়?"

রাকিব আস্তে করে বলল,

"ইম্পর্ট্যান্ট কাজে গেছে।চলে আসবে।"

"ওর কি এমন ইম্পর্ট্যান্ট কাজ? "

রাকিব মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুই বলছে না। এদিকে মেঘ নিস্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে আছে, এক চুল নড়ছে না। মেঘের অবিক্ষিপ্ত আঁখি যুগল আবিরের পরিশ্রান্ত চেহারায় আঁটকে আছে। হালিমা খান, মালিহা খান অঝোরে কেঁদেই চলেছেন কিন্তু মেঘের চোখে এক ফোঁটা পানি নেই, পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে, নেই কোনো অনুভূতি। তানভির হালিমা খানকে ফোন করে আগেই সবটা জানিয়েছিল,হালিমা খানকে শক্ত থেকে মেঘ সহ বড় আব্বু, বড় আম্মু কে নিয়ে আসতে বলছিল। তাই হালিমা খান বুকে পাথর চেপে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেছেন। আবিরের জ্ঞান ফিরছে না, ডাক্তার বলেছেন মাথায় চাপ খাওয়ায় ঘন্টা কয়েক সময় লাগবে। আপাতত হাসপাতালেই রাখতে বলেছেন। এরমধ্যে তানভির আসছে। হালকা রঙের শার্ট টা রক্তের দাগে কালো খয়েরী রঙ ধারণ করেছে। দুহাতে, পায়ে, গায়েও রক্ত লেগে আছে৷ কিছু রক্তের দাগ শুকিয়ে গেছে আর কিছু দাগ এখনও ভেজা। এক্সিডেন্ট এর খবর শুনে তানভির সবার আগে আবিরের কাছে পৌছেছিল৷ রাস্তায় স্প্রীড ব্রেকারের কাছে আবিরের রক্তাক্ত দেহ নিথর হয়ে পরে ছিল৷ টকটকে লাল রক্তে অর্ধেক রাস্তা ভরে গিয়েছিলো। তানভির আবিরকে একায় এম্বুলেন্সে উঠিয়ে হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে আসছে। হাসপাতালে রাকিব আর রাসেল আগে থেকেই উপস্থিত ছিল। রাকিব আর তানভির মিলে আবিরকে ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে নিয়ে গিয়েছিল। আবিরের চিকিৎসা শুরু করা মাত্র তানভির এই অবস্থাতেই হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেছে। আবিরকে রুমে দেয়ার পরপরই রাকিব রাসেলকে বাসায় পাঠিয়েছে, রাকিবের টিশার্ট আর অন্যান্য কিছু জিনিস নিয়ে আসছে। তানভির রুমে ঢুকতেই আলী আহমদ খান হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,

"কোথায় ছিলে?"

তানভির শার্টের হাতার ফোল্ড খুলতে খুলতে গম্ভীর স্বরে বলল,

"কাজ ছিল।"

"তোমার ভাইকে একা ফেলে যাওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল?"

তানভির রাগী স্বরে বলল,

"হয়তো।"

তানভির হালিমা খানকে আগেই বাসা থেকে ড্রেস আনতে বলেছিল। তানভির ব্যাগ থেকে একটা টিশার্ট আর প্যান্ট বের করে ওয়াশরুমে চলে গেছে। আলী আহমদ খান পাশে একটা চেয়ারে দুহাতে মাথা চেপে ধরে বসে আছেন। একমাত্র ছেলে এক্সিডেন্ট করে হাসপাতালে অজ্ঞান অবস্থায় পরে থাকলে কোনো বাবা মা ই ঠিক থাকতে পারেন না। এরমধ্যে মোজাম্মেল খান কল দিয়েছেন। আলী আহমদ খান ফোন রিসিভ করতেই মোজাম্মেল খান স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,

"ভাইজান, কেমন আছো?"

"আলহামদুলিল্লাহ। তুই কেমন আছিস?"

"আলহামদুলিল্লাহ। বাসার সবাই কেমন আছে?"

"কেমন আর থাকবে। তোর ভাতিজা এক্সিডেন্ট করে হাসপাতালে পরে আছে। "

"কে আবির?"

"হ্যাঁ"

"কবে? কিভাবে?"

"আজকেই,কিছুক্ষণ আগে। কিভাবে এক্সিডেন্ট করছে এটা ছেলের জ্ঞান ফিরলে বলতে পারবো। এখনও জ্ঞান ফিরে নি।"

"আমি রওনা দিব এখন?"

"নাহ। ডাক্তার বলছেন তেমন সমস্যা নেই। কয়েক ঘন্টার মধ্যে জ্ঞান ফিরবে। তাছাড়া কাল পরশু নাগাদ হয়তো বাসায় নিয়ে যেতে পারব। তুই কাজ শেষ করেই আয়।"

"আচ্ছা। তানভিরের কি অবস্থা? "

"ওর অবস্থা আমি বলতে পারবো না। আবিরকে হাসপাতালে এনে কোথায় গেছিলো কে জানে মাত্র আসছে। "

"তোমরা সাবধানে থেকো। আর আমি তানভিরের সাথে কথা বলে নিব।"

রাত ১২ টা বাজতে চললো আবিরের এখনও জ্ঞান ফিরে নি৷ তানভির আর রাকিব হাসপাতালের বেলকনিতে বসে আছে। মেঘ আবিরের পায়ের কাছে বসে আছে, হালিমা খান, মালিহা খান দুজনেই আবিরের পাশে বসে আছেন।তানভির রুমে এসে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

"তোমাদের এখানে থাকতে হবে না। আমি আর রাকিব ভাইয়া আছি। কোনো সমস্যা হলে জানাবো।"

মালিহা খান সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন,

"আমি যাব না এখানেই থাকবো। আবিরের জ্ঞান ফিরবে কখন?"

"ডাক্তার বলছেন একটু সময় লাগবে৷ অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো উপায় নেই। "

"জ্ঞান না ফিরলে আমি বাসায় যাব না। "

"বড় আম্মু প্লিজ এমন করো না। তুমি অসুস্থ তাছাড়া বড় আব্বুরও পর্যাপ্ত রেস্ট নেয়া দরকার। তোমরা বাসায় গিয়ে ঘুমাও। সকালে রান্না করে খাবার নিয়ে এসো।"

মালিহা খানের আপত্তি স্বত্বেও তানভির হালিমা খানকে চোখের ইশারায় বুঝালো, ওনাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। মেঘ মাথা নিচু বসে আছে। তানভির মেঘকে উদ্দেশ্য করে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,

"আম্মুরা বাসায় যাচ্ছে তুই ও বাসায় চলে যা। "

মেঘ মাথা নিচু করেই উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,

"আমি কোথাও যাব না।"

" সমস্যা নেই, আমরা আছি, তুই বাসায় যা।"

"আমিও থাকবো।"

তানভির শক্ত কন্ঠে বলল,

"মেঘ"

মেঘের চোখ টলমল করছে, চোখ তুলে তাকালো তানভিরের দিকে৷ করুণ স্বরে বলল,

"প্লিজ ভাইয়া, আমি থাকি। "

তানভির গম্ভীর কণ্ঠে মেঘকে বুঝানোর চেষ্টা করল৷ কিন্তু মেঘ যাবে না মানে যাবেই না। বাধ্য হয়ে তানভির আম্মু, বড় আম্মু আর বড় আব্বুকে বুঝিয়ে শুনিয়ে গাড়ি পর্যন্ত দিয়ে আসছে। হালিমা খান মেঘকে নিয়ে যেতে চাইলে তানভির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

"বনু থাকতে চাচ্ছে থাকুক। তাছাড়া তোমরা তো সকালে আসবেই। তুমি বড় আব্বু আর বড় আম্মুর খেয়াল রেখো৷ "

"ঠিক আছে। সাবধানে থাকিস। আর মেঘকে দেখে রাখিস৷ "

"আচ্ছা যাও তোমরা। "

ওরা চলে যেতেই বন্যার নাম্বার থেকে তানভিরের ফোনে কল আসছে। তানভির কল রিসিভ করতে করতে ভেতরে গেল।

বন্যা উতলা হয়ে শুধালো,

"আবির ভাইয়া কেমন আছেন? "

"আমার ভাইয়ের খবর নেয়ার কি দরকার। চিন্তা করো না, তোমাদের আশা পূরণ হয়েছে।"

"মানে?"

"ভাইয়া এক্সিডেন্ট করে এখন হাসপাতালে ভর্তি আছে। "

"কি বলছেন এসব!"

"তোমরা তো এটায় চাইছিলে।"

বন্যা মলিন স্বরে বলল,

"বিশ্বাস করুন আমি এমন কিছু চাই নি। ওরা মজা করছিল আর.. "

তানভির হুঙ্কার দিল,

"তুমি ওখানে কি করছিলে? তুমি মেঘকে বারণ করতে পারলে না?"

"ও আমার কথা শুনে নি। আমি বারণ.."

"কিসের বেস্ট ফ্রেন্ড তুমি? বারণ করা স্বত্তেও বনু তোমার কথা অমান্য করে কিভাবে?"

বন্যা আস্তে করে বলল,

"মেঘ কোথায়?"

"আছে৷ "

"ও কে একটু দেয়া যাবে?"

" কি দরকার? কথা যখন মানাতেই পারো নি তাহলে এখন আর কথা বলতে হবে না।"

"একটু দরকার ছিল। "

"কি দরকার আমায় বলো।"

"মিনহাজ আর তামিমকে ফোনে পাচ্ছি না৷ ওদের সাথে মেঘের কথা হয়েছে কি না জানতাম।"

"মিনহাজ আর তামিম যেখানে থাকার সেখানেই আছে। বনুর সাথে কথা হয় নি। শান্তি?"

"মানে? কি করেছেন ওদের?"

"যা করার তাই করেছি। আগামী তিনদিন তাদের কোনো খোঁজ পাবে না। "

"কি বলছেন কি এসব? কি করেছেন ওদের? ওরা কোথায়?"

"ওদের প্রতি ভীষণ দরদ দেখা যাচ্ছে! তোমার যদি দুদিনেই বন্ধুত্বের সম্পর্কের প্রতি দরদ উথলায় পড়ে তাহলে ভাবো ওদের জন্য আমার ভাই এক্সিডেন্ট করছে। যে ভাইয়ের সাথে আমার রক্তের সম্পর্ক, জন্মের পর ২৪ বছর যাবৎ ভাইয়ার ছায়ায় আমি বড় হয়েছি। ভাইয়া আমার জীবনে বন্ধুর থেকেও কয়েকগুণ বেশি কিছু৷ ফারদার যদি বন্ধুদের খোঁজ নিতে আমায় কল করেছো তাহলে তোমার খবর আছে বলে রাখলাম"

তানভির কল কেটে মেঘের কাছে আসছে৷ মেঘ তখনও আবিরের পায়ের কাছেই বসে ছিল। তানভির রুমে এসে তপ্ত স্বরে বলল,

"তুই ভাইয়ার কাছে থাক। আমি আর রাকিব ভাইয়া বাহিরে আছি। কোনো ধরনের সমস্যা হলে ডাকিস। "

"আচ্ছা। "

তানভির রুমের লাইট অফ করে একটা ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে যেতে নিয়ে আবার পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল,

"দরজা টা ভেতর থেকে বন্ধ করে দে।"

তানভির চলে যেতেই মেঘ এগিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। হালকা সবুজ রঙের আলোতে আবিরের মুখের পানে তাকিয়ে রইলো মেঘ। নিস্তব্ধ পরিবেশে আবিরকে দেখে ভেতর ফেটে কান্না আসছে মেঘের। আচমকা আবিরের পাশে বসে আবিরের বুকের উপর মাথা রেখে কাঁদতে শুরু করেছে। দীর্ঘসময় ধরে অঝোরে কাঁদছে, মেঘের চোখের পানিতে আবিরের বুক ভিজে গেছে। কত সময় ব্যাপী মেঘের গভীর ক্রন্দন চললো তা জানা নেই। শ্বাস ছেড়ে কান্নারত অবস্থায় বলতে শুরু করল,

"আমি মিনহাজকে পছন্দ করি না। একটুও করি না। আপনাকে ছাড়া আমি কাউকে পছন্দ করি না। আপনি আমার জীবনের প্রথম এবং একমাত্র ভালোবাসা। আবির ভাই কে ছাড়া মেঘ একেবারে নিঃস্ব । বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি৷ আপনাকে আমি এভাবে দেখতে চাই নি। আমি শুধু আপনার মুখে ভালোবাসি শব্দটা শুনতে চেয়েছিলাম আর কিছুই চাই নি আমি। মিনহাজরা আমায় বুঝিয়েছিল আমি এমন আচরণ করলে আপনি আমায় ভালোবাসি বলবেন, আপনার মনের কথা আমায় জানাবেন৷ ওদের কথা মেনে আমি আপনার সাথে উল্টাপাল্টা আচরণ করছি। আমায় মাফ করে দেন প্লিজ৷ আমি আর জীবনেও কারো কথা শুনবো না৷ আপনি ভালো না বাসলেও আমি কোনোদিন বাড়াবাড়ি করবো না। আমি সারাজীবন আপনাকে এক তরফা ভালোবাসবো। কোনোদিন কোনো অধিকার দেখাবো না। আপনি সুস্থ হয়ে উঠুন প্লিজ। আপনি অসুস্থ থাকলে আপনার চড়ুই এর কি হবে!"

কিছুক্ষণ চুপ থেকে মেঘ আবার বলতে শুরু করলো,

"ছোট বেলা আপনি আমায় একটা থাপ্পড় দিয়েছিলেন বলে আমি আপনার সাথে দিনের পর দিন কথা বলি নি৷ আপনি অনেক চেষ্টা করেছেন তবুও আমি বলি নি। আপনি তারপরও আমায় নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেই গেছেন। দেশে ফেরার সময় সবচেয়ে বেশি গিফট আমার জন্যই নিয়ে আসছেন৷ আপনি বাইক কিনে বাসায় আসার পর প্রথমবার আপনাকে দেখে আমার হৃৎস্পন্দন থেমে গেছিলো। সেদিন আমি প্রথমবারের মতো আপনার প্রতি দূর্বলতা অনুভব করেছিলাম। তারপর থেকে প্রতিদিন প্রতিক্ষণে আপনার প্রতি দূর্বল হতে শুরু করি। দেখতে দেখতে সেই দূর্বলতা কখন ভালোবাসায় পরিণত হয়ে গেছে আমি বুঝতেই পারি নি। আপনি আমার কাছাকাছি থাকলে আমার আকাশে রংধনু উঠে, মনটা প্রজাপতির মতো ঘুরে বেড়ায়৷ আপনি দূরে চলে গেলেই মনের উঠোনে বৃষ্টি নামে৷ ক্ষণে ক্ষণে আপনি নিজের অজান্তেই আমায় নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছেন। আপনি হয়তো জানেন ও না আপনাকে দেখার জন্য প্রতিদিন কত ঘন্টা বেলকনিতে অপেক্ষা করি, কত রাত নির্ঘুম কাটায়। আপনার এক ঝলক হাসি দেখার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা আপনার অভিমুখে চেয়ে থাকি। আপনার প্রতি এতবছরের ক্রোধ কয়েক মাসেই কিভাবে যেন প্রণয়ে রূপ নিয়েছে। এখন রাগ করলেও সেই রাগ বেশিসময় স্থির হয় না। আপনার একটু যত্নেই সব ভুলে যায়। কিন্তু সব ভুলে গেলেও আপনার আশেপাশে কোনো মেয়ের ছায়া আমি কোনোভাবেই সহ্য করতে পারি না৷ মালা আপু,এমপির মেয়ের আচরণে আমায় যতটা রাগিয়েছিল তার থেকে কয়েকগুণ বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম, যেদিন আপনি বলেছিলেন আপনি বিবাহিত, একটা বাচ্চা আছে। তখন ২ রাত আমি শুধু কেঁদেই ছিলাম। আপনার অনাদেয় কর্মকাণ্ড আর কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণে ক্ষুদ্ধ হয়ে মিনহাজদের তালে তাল মিলিয়েছিলাম। আপনার অধিকারবোধ আমায় বরাবরই আকৃষ্ট করে। তবে আজ কেন অধিকার দেখান নি? আমি আপনার কথায় "হ্যাঁ" বলেছিলাম যাতে আপনি আপনার মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেন। আপনি তখন আমায় দুটা থাপ্পড় দিয়ে কেন কিছু বললেন না। কেন আপনি নিশ্চুপ থেকে নিজের ক্ষতি করেছেন?"

মেঘের কান্না ধীরে ধীরে কমে এসেছে তবে এখনও ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদঁছে৷ আবিরের বুকে মাথা রেখেই দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,

" আজকের পর আর কোনোদিন কোনোপ্রকার বাড়াবাড়ি করবো না। আপনি যেভাবে চান, আমি সেভাবেই চলবো। আপনার ভালোবাসা আদায় করতে আর উঠেপড়ে লাগবো না। আপনি ভালোবাসলেও আমি আপনার, আপনি ভালো না বাসলেও আমি আপনার। তবুও প্লিজ সুস্থ হয়ে উঠুন। "

গভীর রাত পর্যন্ত মেঘ আবোলতাবোল বলেই গেছে, আর আবিরকে ডেকেছে। ধীরে ধীরে মেঘ শান্ত হয়ে গেছে। ক্লান্তিতে আবিরের বুকে মাথা রেখে, দু'হাতে জড়িয়ে ধরা অবস্থাতেই ঘুমিয়ে পরেছে। ১ মিনিট, ২ মিনিট, ৫ মিনিট পর ঘুমের মধ্যে মেঘের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেছে। সহসা পিটপিট করে চোখ মেলল আবির। জ্ঞান ফিরেছে অনেকক্ষণ আগে, প্রেয়সীর আবেগজড়িত অনুদ্বিগ্ন অনুভূতি শুনতে ইচ্ছে করেই চোখ বন্ধ করে রেখেছিল৷ আবির চোখ নামিয়ে তাকালো মেঘের ক্রন্দিত মুখের পানে। মৃদু আলোতে আবিরের প্রেয়সীকে দেখলো খানিকক্ষণ। সহসা চোখ বন্ধ করে লম্বা করে শ্বাস ছাড়লো।

এটা প্রথমবার নয়৷ মেঘ আবিরের জন্য প্রথমবার যখন কেঁদেছিল তারপর ১ সপ্তাহ গলা দিয়ে কথা বের হয় নি মেঘের। তখন মেঘের বয়স ৪ কি ৫ আর আবিরের বয়স ১২ কি ১৩ চলে। আবির তখন হঠাৎ করে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পরেছিল। টানা ১৫ দিনে উপরে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি ছিল। অবুঝ মেঘের জীবনে আবির তখন একমাত্র খেলার সঙ্গী ছিল। আবির আর তানভিরের বয়সের পার্থক্য ২ বছর হওয়ায় তানভিরের স্মৃতি আবিরের মাথায় ছিল না। তবে মেঘ জন্মের সময় আবির ৭-৮ বছরের ছিল বিদায় মোটামুটি বুঝতো৷ প্রথম বোন হওয়ায় মেঘকে সর্বোচ্চ আদরে রেখেছে আবির৷ মেঘের আদো আদো কন্ঠের ডাক এড়িয়ে খেলতে যাওয়ার সাধ্যি ছিল না আবিরের। সারাক্ষণ বাড়িতেই মেঘের সঙ্গে খেলতো। মেঘ ঘুমালে খেলতে বের হতো ৷ ৭-৮ বছর বয়সের ছেলের চোখে মেঘ তখন বোন মানে বোন ই ছিল৷ মেঘকে বোন ব্যতীত অন্য কোনো নজরে দেখে নি আবির। ধীরে ধীরে আবির, মেঘ বড় হতে শুরু করেছে। আবিরের যত্নে মেঘ তখন থেকেই আবিরের প্রতি উন্মাদ ছিল। শিশুদের যারা বেশি আদর করে তারা তাদের সঙ্গেই বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। হঠাৎ আবিরের অসুস্থতা ছোট্ট মেঘের মনেও গভীর আঘাত দিয়েছিল। আবির হাসপাতালে থাকাকালীন মেঘকে কেউ নিয়ে যায় নি ৷ ১৫ দিন পর আবিরের শারীরিক অবস্থা এতটায় দূর্বল হয়ে পরেছিল যে ডাক্তার চিকিৎসা চালাতেও হিমসিম খাচ্ছিলো। আবির কোনোকিছুতেই রেসপন্স করছিল না৷ হার্টবিট একেবারে কমে গেছিলো। কোনোকারণে ব্রেইনে প্রেশার পরেছিল। মৃত্যুর সময় অতি সন্নিকটে চলে আসছিলো৷ ডাক্তার সঠিক রোগ ধরতে পারছিল না, কোনো চিকিৎসা চলছিল না। নিরুপায় হয়ে ডাক্তার বাড়িতে জানিয়েছিল,

" আবির যদি নিজ থেকে রেসপন্স না করে তবে তাকে বাঁচানো সম্ভব হবে না।"

এই কথা শুনে বাড়ির সবাই হাসপাতালে হাজির হয়েছিল৷ সেদিন প্রথমবারের মতো ছোট্ট মেঘ আবিরের উপর উপুড় হয়ে পরে কেঁদেছিল। কাঁদতে কাঁদতে মেঘ বলছিল,

"ভাইয়া উঠো, আমার সাথে খেলবে না?"

মালিহা খান কেঁদে বলেছিলেন,

"তোর ভাই হয়তো আর কোনোদিন তোর সাথে খেলতে পারবে না"

ছোট্ট মেঘ তখনই হুঙ্কার দিয়ে উঠেছিল,

"চুপ করো, ভাইয়ার কিছু হবে না।"

আবিরকে শক্ত করে ঝাপ্টে ধরে আর্তনাদ করে বলেছিল,

"তোমার কিছু হলে আমার কি হবে! তুমি মরে গেলে কিন্তু আমিও মরে যাব। ভাইয়া উঠো। কথা বলো আমার সাথে।"

সবাই টেনেও মেঘকে আবিরের বুকের উপর থেকে উঠাতে পারে নি। মেঘ কাঁদতে কাঁদতে একটা কথায় বার বার বলছিল,

" তুমি মরলে আমায় নিয়ে মরবা। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। আমিও মরে যাব।"

মেঘের নিরন্তর কান্নায় হঠাৎ আবিরের জ্ঞান ফিরে, দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে পিটপিট করে তাকাতেই একে একে চোখে পরে বাবা, মা, চাচ্চু, মামনির কান্নারত মুখমণ্ডল সেই সাথে অনুভব করে পিচ্চি দুই হাতের স্পর্শ। আবিরের জ্ঞান ফেরায় সবাই যখন আবির কে ডাকছিল মেঘও দু'হাতে আবিরের দু গালে আলতোভাবে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলছি,

"ভাইয়া, কথা বলো। ওরা বলছে তুমি নাকি মরে যাবে। তুমি একবার বলো তোমার কিছু হবে না। "

আবিরের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল তবুও মেঘের কান্না দেখে মেঘের হাতে স্পর্শ করে অনেক কষ্টে বলেছিল,

"আমার কিছু হবে না।"

আলী আহমদ খান দ্রুত গিয়ে ডাক্তার নিয়ে আসছিলেন। ডাক্তার আবারও পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করেন। আবিরের হার্টবিট আগের তুলনায় বেড়েছে দেখে ডাক্তার পুনরায় চিকিৎসা শুরু করেছেন। সেই থেকে আরও প্রায় ৭ দিন আবির হাসপাতালে ভর্তি ছিল। মেঘ একবারের জন্যও বাসায় যায় নি। সারাক্ষণ আবিরের মাথার কাছে বসে থাকতো।মেঘ ঘুমালে বাসায় নিয়ে যাবে বলে আবিরকে জরিয়ে ধরে ই ঘুমাতো। ৭ দিন পর আবিরকে বাসায় নিয়ে আসছে। আবির আগের তুলনায় অনেকটায় সুস্থ হয়ে গিয়েছিল। বাসায় আসার পরও মেঘের আহ্লাদের কমতি ছিল না সারাক্ষণ আবিরকে দেখতো, আবির খেয়েছে কি না, ঔষধ খেয়েছে কি না, ঠিকমতো ঘুমাচ্ছে কি না সব নজর রাখায় যেন মেঘের একমাত্র দায়িত্ব ছিল। ১২-১৩ বছর বয়সের কিশোরের মনে হঠাৎ করেই মেঘের প্রতি অন্যরকম অনুভূতি জন্মাতে শুরু করল। জন্মের পর থেকে ৪-৫ বছর বয়স পর্যন্ত যাকে বোনের নজরে দেখে এসেছে হুট করেই তার প্রতি ভিন্ন এক টান অনুভব করতে শুরু করল। মেঘের আহ্লাদী কন্ঠে বলা প্রতিটা কথা আবিরের হৃদয় ছুঁয়ে যেতো। কিছুদিন পর আবির মোটামুটি সুস্থ হওয়ার পর একদিন সোফায় বসে টিভি দেখছিল। তখন মেঘ ছুটে এসে আবিরের পাশে বসতে বসতে বলছিল,

" ভাইয়া তুমি জানো তুমি সুস্থ হয়েছো কেন?"

"কেন?"

"আম্মুরা বলছে, তুমি শুধু আমার জন্য সুস্থ হয়েছো। আমি কান্না করছিলাম বলেই আল্লাহ তোমাকে সুস্থ করে দিয়েছেন৷ বুঝলা?"

আবির মলিন হেসে বলেছিল,

"এখন আমার কি করতে হবে?"

"তুমি সবসময় আমার সাথে খেলবা, আমায় ঘুরতে নিয়ে যাবে, আমাকে অনেক আদর করবা, আর কখনো আমায় ছেড়ে যেতে পারবা না। "

আবির সেদিন মেঘের হাতে হাত রেখে গুরুতরভাবে বলেছিল,

"আজ,এই মুহুর্তে আবির মেঘকে কথা দিচ্ছে, আবির কোনোদিন তার মেঘকে ছাড়বে না। যাই হয়ে যাক না কেন, আবিরের প্রাণ মেঘেতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।"

মেঘ বলেছিল,

"মনে থাকে যেন!"

আবির হেসে বলেছিল,

"তুই ভুলে গেলেও আমি কখনো ভুলবো না।"

সেদিন থেকে আবিরের মন মেঘেতে আঁটকে গেছে। আবির মেঘের টানে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছিল। মেঘের আহ্লাদী আবদার আবিরকে মেঘের প্রতি সিরিয়াস করেছিল৷ ধীরে ধীরে আবির বড় হতে শুরু করেছে সেই সাথে মেঘের সাথে দূরত্ব বেড়েছে। মেঘও তার ছোটবেলার স্মৃতি ভুলতে শুরু করেছে৷

এত বছর পর আবিরের মেঘ দ্বিতীয়বারের মতো আবিরের অসুস্থতায় এভাবে কাঁদছে। আবির গভীর ভাবনা শেষে চোখ মেলে তাকিয়ে আছে মেঘের অভিমুখে৷ মেঘ গভীর ঘুমে বিভোর হয়ে আছে। চোখের পানি এখনও গাল বেয়ে গড়িয়ে পরছে৷ আবির বামহাতে মেঘের গাল মুছে, আলতো হাতে চুলগুলো ঠিক করে দিল৷ বাকি রাত আবিরের নির্ঘুম কেটেছে। আবিরের বুকে শুয়ে আছে আবিরের কাদম্বিনী, আবির অপলক দৃষ্টিতে ক্ষুদ্র আলোতে তার কাদম্বিনীকে দেখেই রাত কাটিয়ে দিয়েছে । ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে এমন সময় আবির ঘুমিয়েছে। তার ঘন্টাখানেক পর আচমকা মেঘের ঘুম ভাঙে। নিজেকে আবিষ্কার করে আবির ভাইয়ে প্রশস্ত বুকে। চোখ তুলে তাকায় আবিরের মুখের পানে। আবিরকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে উঠতে নিলে পিঠে ভারী কিছু অনুভব করে। ঘুমের মধ্যে চুলের খোঁপা খুলে এলোমেলো হয়ে গেছিলো, চুলের কারণে কিছু বুঝতে পারছে না। ঘাড় ঘুরিয়ে আড়চোখে তাকাতেই খেয়াল করলো, আবির বামহাতে মেঘের পিঠ বরাবর শক্ত করে ধরে রেখেছে যাতে ঘুমের মধ্যে মেঘ পড়ে না যায়। মেঘ বিপুল চোখে আবিরের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। নিজের অজান্তেই মেঘের ঠোঁটে হাসি ফুটলো।

■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■

#Ch.51 (প্রথমাংশ)

যাকে ঘিরে মেঘ লক্ষাধিক স্বপ্নের পাহাড় বুনেছে সেই আবির ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে সারারাত কাটিয়েছে এটা ভেবেই মেঘের দু'চোখ আনন্দে ছলছল করছে। বুকের ভেতর অজানা অনুভূতি জেগে উঠছে। আবিরের হাতের দিকে তাকিয়ে মেঘের মন অধিকতর পুলকিত হচ্ছে। মেঘ আড়চোখে নিগূঢ় দৃষ্টিতে আবিরের সুষুপ্ত ধৃষ্টতায় কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো, চোখ সরানো বা পলক ফেলার কথা বেমালুম ভুলে গেল। অজান্তেই কাদম্বিনীর ঠোঁটে লেগে আছে ললিত হাসি। মেঘের স্বাভাবিক চেহারা মুহুর্তের মধ্যেই লজ্জায় লাল হয়ে গেছে, ক্ষণে ক্ষণে আবিরের অভিমুখে চেয়ে থাকার শক্তি হারিয়ে ফেলছে, দুর্ভেদ্য আবেশে মেঘের চোখ টানছে। মনের বিরুদ্ধে নিজেকে অক্লিষ্ট রাখার নিরবধি চেষ্টা চালাচ্ছে। আচমকা মেঘের নিঃশ্বাস থমকে গেছে মনের কোণে একটা গূঢ় প্রশ্ন উদ্গত হলো। মেঘ নিজেকে নিজে প্রশ্ন করল,

" আবির ভাইয়ের জ্ঞান কখন ফিরেছে? আর ওনি কি সজ্ঞানে আমায় ধরেছেন নাকি ঘুমের ঘোরে?"

মেঘ শুকনো ঢোক গিলল। হুর হুর করে বুক কাঁপছে সাথে লজ্জায় রাঙা হয়ে আছে কাদম্বিনীর উজ্জ্বল চেহারা। এভাবে আর থাকা সম্ভব হচ্ছে না। মেঘের হৃদপিণ্ডের কম্পনে আবির যেকোনো সময় সজাগ হয়ে যেতে পারে তাই মেঘ ঘুরে কাঁপা কাঁপা হাতে আবিরের হাত টা সরিয়ে কোনোরকমে উঠলো। চুল ঠিক করে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে মাথায় ওড়না দিতে দিতে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিল। হাতে ফোন নেই, নেই কোনো ঘড়ি, কত বেলা হয়েছে তা বুঝার উপায়ও নেই। মেঘের দরজা খোলার শব্দে তানভির হকচকিয়ে উঠল। এসে ধীর কন্ঠে শুধালো,

"ভাইয়ার জ্ঞান ফিরেছে?"

মেঘ শান্ত স্বরে বলল,

"মনে হয় ফিরেছে। এখন ঘুমাচ্ছেন। "

ভাই বোনের কথোপকথন শুনে রাকিবের ঘুম ভেঙে গেছে। তড়িঘড়ি করে উঠে উত্তেজিত কন্ঠে প্রশ্ন করল,

"আবির উঠেছে?"

মেঘ এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে বলল, "নাহ"।

মেঘ সাইড হয়ে দাঁড়াতেই রাকিব আর তানভির রুমে ঢুকলো। ওদের হালকা পাতলা কথাতে আবিরের ঘুম ভেঙে গেছে। আবির চোখ পিটপিট করে একে একে তানভির, রাকিব আর মেঘের দিকে তাকালো। সম্পূর্ণ রুমে একবার চোখ বুলিয়ে আবির পুনরায় তানভির আর রাকিবের দিকে তাকিয়েছে। রাকিব ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর মুখ করে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। আবির এক মুহুর্ত চেয়ে থেকে অকস্মাৎ মলিন হাসলো। আবিরের হাসি দেখে রাকিবের মেজাজ গরম হচ্ছে।ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে রাকিব মেঘকে উদ্দেশ্য করে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

"মেঘ তুমি একটু বাহিরে যাও তো। "

মেঘ সরু নেত্রে রাকিবকে দেখে সাথে সাথে তানভিরের দিকে তাকালো। তানভির চোখ দিয়ে ইশারা করতেই মেঘ চুপচাপ রুম থেকে বেড়িয়ে গেছে। রাকিব রাগী স্বরে বলল,

"তানভির দরজা টা বন্ধ কর"

রাকিবের কথা মতো তানভির তাই করল৷ রাকিব আশেপাশে তাকিয়ে হঠাৎ ই এগিয়ে গিয়ে রুমের এক কর্ণার থেকে একটা পাইপ মাথার উপর তুলে দ্রুত আসতে নিলে,

আবির চেঁচিয়ে উঠে,

"এইইইই!"

 তানভির রাকিবের দিকে তাকিয়ে সহসা ছুটে গিয়ে পেট বরাবর শক্ত করে ধরে বলল,

"কি করছো তুমি!"

রাকিব রাগান্বিত কন্ঠে বলল,

"ওর যে হাত আর পা টা ঠিক আছে ঐটাও ভেঙে ফেলবো। মরার যখন এত শখ তাহলে ভালো করেই মা*রি। "

তানভির ধীর কন্ঠে রাকিবকে বলল,

"থাক বাদ দাও। এমনিতেই ভাইয়ার অবস্থা খারাপ। "

রাকিব পাইপ হাতে নিয়ে আবিরের কাছে আসতে আসতে রাগে কটকট করে বলল,

" তোর ফা*টা মাথা আরও ফা*টিয়ে দিব?"

আবিরের ঠোঁটে এখনও হাসি লেগেই আছে। আবির মৃদু স্বরে বলল,

" তোর ইচ্ছে হলে দে ফাটিয়ে।"

রাকিব গম্ভীর মুখ করো বলল,

"আবির! তোর সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি। তুই কিভাবে পারলি এমন কাজ করতে?"

আবির ভ্রু গুটিয়ে মুখ ফুলিয়ে বলল,

"আমি ইচ্ছে করে করছি নাকি!"

রাকিব পুনরায় বলল,

" মেঘ কি বলছে না বলছে তুই এতেই চটে গিয়ে মর-তে চলে গেলি? তুই কি ভাবছিলি, তুই মরে গেলেই সবকিছুর সমাধান হয়ে যাবে? আমাদের আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারতি ত! মেঘ বললেই হলো! প্রয়োজনে মেঘকে বিয়ের আসর থেকে উঠিয়ে এনে হলেও তোর সাথে বিয়ে দিব। আর কোন ছেলেকে সামান্য পছন্দ করে বলাতে তুই এমন কান্ড করে বসলি! মেঘের মনে যত যেই থাকুক সবগুলোকে মে*রে সেখানে তোর বসতি স্থাপন না করলে আমিও রাকিব না।"

আবির মুচকি হেসে বলল,

" আমার মেঘ আমার ছিল, আমার আছে আর আমৃত্যু আমার ই থাকবে। ও কোনো ছেলেকে পছন্দ করা তো দূর, কোনো ছেলের দিকে ভালোভাবে তাকিয়েই দেখে না। ওর মন মস্তিষ্ক জুড়ে এই আবির ব্যতীত অন্য কোনো পুরুষের অস্তিত্ব নেই। আর কোনোদিন কেউ আমার কাদম্বিনীর প্রিয় পুরুষ হতে পারবেও না। এই কনফিডেন্স আমার আছে। "

"তাহলে মিনহাজের থেকে ফুল নিল যে?"

"ফুল নিতে দেখছিস?"

"নাহ। কিন্তু"

"ছবি যা দেখছিস সবগুলোতে মিনহাজ ওকে ফুল অফার করছে। কিন্তু আমার মেঘ সেই ফুল ছুঁয়েও দেখে নি। "

"তারপরও ঐ ছেলের সাহস কিভাবে হলো এভাবে মেঘকে ফুল দেয়ার?"

"এটা ওদের প্ল্যান ছিল। ওরা ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করার প্ল্যান করেছিল যাতে সেটা আমার চোখে পরে। কিন্তু আমি ওখানে চলে যাওয়াতে ওরা থতমত খেয়ে ফেলছে। "

"তুই এসব কিভাবে জানিস? মেঘ বলছে?"

"আমি আগে থেকেই সব জানি তাছাড়া মেঘও কিছুটা বলছে। "

"হারা*মী, তুই যদি আগে থেকেই সব জানতিস তাহলে এক্সিডেন্ট করতে গেছিলি কেন?"

আবির গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,

" আমি মেঘকে বেশি কিছুই বলতাম না৷ বরং ওদের সাথে আড্ডা দিয়ে আমি ওকে নিয়ে চলে আসতাম৷ কিন্তু ঐ ছেলের এক্সট্রা কেয়ার দেখে সঙ্গে সঙ্গে পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেছিল। না বুঝেই হুট করে প্রশ্ন করে বসি, মেঘ সেই ছেলেকে পছন্দ করে কি না! আমার ১০০% এর জায়গায় ১০০০% কনফিডেন্স ছিল মেঘ না বলবে। অন্তত আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ও কোনোদিন মিথ্যা বলতে পারবে না। কিন্তু ও যখন আমার চোখে চোখ রেখে হ্যাঁ বললো তখন এক মুহুর্তের জন্য মনে হচ্ছিলো আকাশটা বোধহয় আমার মাথায় ভেঙে পরেছে। আমি দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পাচ্ছিলাম না। আমি আগে থেকেই জানি এসব কিছু ওদের প্ল্যান, ওরা আমার মুখ থেকে কিছু শুনতে চাচ্ছে কিন্তু ওর "হ্যাঁ" শুনার পর নিজের উপর উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম। যখন বুঝতে পেরেছি এখানে থাকাটা রিস্ক তখন ই আমি সেখান থেকে চলে গেছি।"

"একটু শান্ত থাকলেই মাথাটা ঠিক হয়ে যেত। তাহলে এভাবে এক্সিডেন্ট করতে হতো না! "

"আরে বাবা, আমি ইচ্ছেকৃত এক্সিডেন্ট করি নি। আমি যেখানে জানি ও আমার, সেখানে এক্সিডেন্ট করে ম*রতে বসা বোকামি ছাড়া কিছুই না। "

"তো করলি কিভাবে?"

"ফাঁকা রাস্তা, মন খারাপ তাই আমি মোটামুটি ভালো স্প্রীডেই বাইক চালাচ্ছিলাম। প্রায় জনমানবশূন্য এক জায়গায় হুট করে এক পাগল বাইকের সামনে চলে আসছে। পাগলের অবস্থা তো জানিস ই, রাস্তার মাঝখানে এদিক সেদিক ছুটাছুটি করছে। যখন বুঝতে পারছি পাশ কেটে যাওয়া কষ্টকর হবে ততক্ষণে প্রায় কাছাকাছি চলে গেছি, পাগলের আলামত দেখতে দেখতে স্প্রীড ব্রেকার খেয়াল ই করি নি আচমকা ব্রেক করাতে স্প্রীড ব্রেকারে ধাক্কা লাগছে। এমনিতেই মাথা ভর্তি দুশ্চিন্তা, ধাক্কা খাওয়ায় বাইক কন্ট্রোল করার কথা ভুলেই গেছিলাম। এরপর কি হয়ছে জানি না।"

তানভির তপ্ত স্বরে বলল,

"বড় আব্বু কাল বেশি কিছু বলে নি। আজকে তোমার খবর ই আছে।"

আবির মলিন হেসে হঠাৎ ই সূক্ষ্ণ নেত্রে তানভিরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

"তুই ওদের কিছু করিস নি তো?"

রাকিব হেসে বলল,

"বেশি কিছু করে নি। জাস্ট ২ দফায় হালকার উপর ঝাপসা আপ্যায়ন করেছে আর কি!"

আবির সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে পুনরায় শুধালো,

"রাকিব যা বলছে সত্যি? কি করছিস তুই?"

তানভির চোখ নামিয়ে মৃদুস্বরে বলল,

" যা করার তাই করেছি। তোমার তাদের নিয়ে ভাবতে হবে না।"

"এখন কোথায় আছে?"

"আছে কোনো এক জায়গায়৷ "

"তুই বন্যার সামনে মে-রেছিস?"

"হ্যাঁ!"

"তোরে আমি কি বুঝাইলাম তানভির! আর তুই এটা কি করলি?"

"আমি এত মেপে চলতে পারবো না ভাইয়া৷ । ঐটা পাবলিক প্লেইস না হলে আর রাকিব ভাইয়ারা আমায় না আটকালে গতকাল ঐখানেই ঐ ছেলেকে খু**ন করতাম। "

আবির শান্ত স্বরে বলল,

" যুদ্ধ হয় সমানে সমানে। ওরা যতই লাফালাফি করুক না কেন, তোর, আমার কাছে ওরা এখনও অনেক ছোট। "

তানভির ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

"ছোট হয়ে বড়দের মতো আচরণ করেছে তাই আমিও আমার রূপ দেখিয়েছি। "

"তোর আচরণে বন্যার তোর প্রতি বিদ্বেষ না চলে আসে!"

"আসলে আসুক। আমার জীবনে আমার ভাই-বোনের সামনে বাকি সবকিছু গুরুত্বহীন। সে যদি এতটায় ম্যাচিউর হয় তাহলে আশা করি অবশ্যই বুঝবে।"

আবির টুকটাকি কথা বলে হঠাৎ ই গুরুতর কন্ঠে বলল,

" আমার জান টা বাহিরে একা আছে। তানভির দেখ তো, আমার ময়নাপাখি টা কি করছে!"

রাকিব মৃদু হেসে বলল,

"এত পিরিত দেখাতে হবে না। তোর বাসর করার ইচ্ছে ছিল আমাদের জানাতি। সম্পূর্ণ অফিস সাজিয়ে, প্রকাণ্ড আয়োজন করে তোদের বাসরের ব্যবস্থা করতাম।"

আবিরের চোখ উজ্জ্বলতায় ঝলমল করছে, মুখে লাজুক হাসি। তানভির নিঃশব্দে হেসে পা বাড়াতেই রাকিব সহসা উত্তেজিত কন্ঠে শুধালো,

"বাই দ্য ওয়ে, বাসর রাত কেমন কাটলো আবির?"

আবির ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে উদাসীন কন্ঠে বলল,

"ফুলের সুভাস ছাড়া বাসর রাতের সৌন্দর্য ফিকে মনে হচ্ছিলো। ফুল দিয়ে সাজাতে পারলি না ?"

রাকিব আবারও চেচিয়ে উঠল,

"বাঁশ কই রে। বাঁশটা আন কেউ। "

তানভির মেঘকে ডেকে নিয়ে আসছে। মেঘ নাকের ডগা পর্যন্ত ওড়না টেনে রেখেছে৷ মেঘ রুমে আসতেই আবির আড়চোখে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে । কিন্তু মেঘের দৃষ্টি নিচের দিকে। ঘুরে এসে কোনোরকমে আবিরের পায়ের কাছে মাথা নিচু করে বসলো। তানভির আর রাকিব নাস্তা আনতে বেড়িয়ে গেছে। রুমে শুধু আবির আর মেঘ। আবির এক দৃষ্টিতে মেঘকে দেখছে। পাতলা ওড়নার আড়ালে মেঘের কুন্ঠ অভিমুখে আবির নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে। তৎক্ষনাৎ রুমে আলী আহমদ খান সহ মালিহা খান এবং হালিমা খান ঢুকলেন। আলী আহমদ খান রাগী স্বরে বললেন,

"জ্ঞান ফিরেছে তাহলে"

আবির খানিক হাসলো আর কিছুই বলল না। আলী আহমদ খান গুরুতর কন্ঠে শুধালেন,

"তুমি কি ঠিক করেই নিয়েছো, তোমার আম্মু আর আমাকে শান্তিতে থাকতে দিবে না?"

আবির কন্ঠ খাদে নামিয়ে শান্ত স্বরে বিড়বিড় করে বলল,

"আপনাদের শান্তির জন্য প্রয়োজনে নিজের মনকে পু*ড়িয়ে ছারখার করে দিব।"

আলী আহমদ খান ভারী কন্ঠে শুধালেন,

"তানভির কোথায়?"

"নাস্তা আনতে গেছে। "

আলী আহমদ খান হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,

"তোমাদের মতো বয়সে বিজনেস করে একা হাতে সংসার সামলিয়েছি। আর তোমরা? আজকে তুমি এক্সিডেন্ট করে পরে আছো, দুদিন পর তানভির এক্সিডেন্ট করবে। এই বয়সে এসেও তোমাদের জন্যই টেনশন করতে হবে নাকি?"

আবির মৃদু হেসে ভারী কন্ঠে বলল,

"এই তানভির, তুই কিন্তু কোনোভাবেই এক্সিডেন্ট করিস না। "

তানভির "আচ্ছা" বলতেই আলী আহমদ খান পেছন ফিরে তাকালেন। তানভির রুটি কলা আরও অন্যান্য খাবার নিয়ে আসছে। মালিহা খান শীতল কণ্ঠে আবিরকে বললেন,

" সাবধানে গাড়ি চালাতে পারিস না? "

হালিমা খান স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,

" খাবার নিয়ে আসছি। আগে খাবার খেয়ে নে।"

মেঘ নিরব দর্শকের মতো মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে আছে। মালিহা খান আবিরের হাত মুখ ধৌয়ে দিয়েছেন। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে দেখে গেছেন। ডাক্তার চলে যাওয়ার পর মালিহা খান নিজের হাতে আবিরকে খাইয়ে দিতে লাগলেন।তানভির, রাকিব ও খাচ্ছে। হালিমা খান স্বাভাবিক কন্ঠে শুধালেন,

"মেঘ তুই খাবি না?"

"খিদা নেই। পরে খাবো।"

আবির তানভিরের দিকে তাকিয়ে ইশারা দিতেই তানভির বসা থেকে উঠে এসে স্বাভাবিক কন্ঠে মেঘকে বলল,

"হা কর"

মেঘ বলে,

"খাবো না আমি।"

"হা করতে বলছি। "

মেঘ মাথা তুলে অল্প করে হা করলো। তানভির মেঘকে খাইয়ে নিজেও খেয়ে নিয়েছে। খাওয়া শেষ হওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যে জান্নাত আর আবিরের ফুপ্পি রুমে ঢুকলো। ওনাদের দেখে সবাই আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে আছে। আলী আহমদ খান বোনের দিকে এক পলক তাকিয়ে ভারী কন্ঠে বললেন,

"তুই এখানে? তোদের কে খবর দিয়েছে?"

জান্নাত ধীর কন্ঠে বলল,

"আসসালামু ওয়ালাইকুম। আমার ভাইয়া আমাদের খবর দিয়েছেন।"

মাহমুদা খান কোনো কথা বললেন না । ভেতরে এসে আবিরের দিকে তাকিয়ে তপ্ত স্বরে বললেন,

"এখন শরীর কেমন?"

আবির আড়চোখে মেঘের দিকে তাকালো সহসা স্বাভাবিক কন্ঠে জবাব দিল,

"আলহামদুলিল্লাহ ভালো। "

আলী আহমদ খান গম্ভীর কণ্ঠে শুধালেন,

"তোমার ভাইয়া কে?"

জান্নাত রাকিবের দিকে তাকিয়ে অল্প হেসে বলল,

"রাকিব ভাইয়া। "

মালিহা খান বিস্ময় সমেত একবার রাকিবকে দেখল আবার জান্নাত কে। হুবহু চেহারার মিল না থাকলেও দুজনের চোখ দেখতে একই রকম। মালিহা খান কন্ঠ ভারী করো প্রশ্ন করলেন,

"তুমি রাকিবের কেমন বোন?"

"আপন বোন।"

 আলী আহমদ খান রাকিবের দিকে তাকিয়ে প্রখর তপ্ত স্বরে শুধালেন,

"জান্নাত তোমার বোন?"

"জ্বি আংকেল। আমার একমাত্র বোন।"

হালিমা খান আর মালিহা খান শুধু মুখ চাওয়া চাওয়ি করছেন। মালিহা খান প্রশ্ন করলেন,

" তুমি রাকিবের বোন সে কথা আগে বলো নি কেন?"

"কখনো তেমন প্রয়োজন হয় নি সেজন্য আর বলা হয় নি। "

"আবির কে চিনতা না?"

"জ্বি। মোটামুটি চিনতাম। "

আলী আহমদ খান জান্নাতকে প্রশ্ন করলেন,

"কিন্তু তোমাকে তো তানভির বাসায় আনছিল৷ তানভিরকে তুমি কিভাবে চিনো?"

"তানভির ভাইয়ার সাথে একটা পোগ্রামে দেখা হয়ছিল।। পরিচয় দেয়ায় চিনতে পারছি। তখন কথায় কথায় ওনি মেঘের কথা বলছেন। মেঘের জন্য টিচার খোঁজছিলেন। তখন ভাবলাম মেঘকে আমিই পড়ায়, সেভাবেই মেঘকে পড়ানো শুরু। "

হালিমা খান , মালিহা খান ও আলী আহমদ খানের একের পর এক প্রশ্নের প্রতিত্তোরে জান্নাত প্রতিবার ই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। কোনো প্রকার মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সাবলীল ভঙ্গিতে সকল উত্তর দিয়েছেন৷

আলী আহমদ খান অফিসে চলে যাবেন। সবার থেকে বিদায় নিয়ে দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার থমকে দাঁড়িয়েছেন। মাহমুদা খানের দিকে তাকিয়ে ভারী কন্ঠে বললেন,

"বাসায় আসিস।"

জান্নাত আলী আহমদ খানের দিকে তাকাতেই আলী আহমদ খান মৃদু হেসে বললেন,

"তোমার শ্বাশুড়িকে নিয়ে আমাদের বাসায় এসো।"

"জ্বি আচ্ছা। "

■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■

#Ch.51 (শেষাংশ)

হাসপাতালের বেডে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে আবির। গতকাল এক্সিডেন্টের পর থেকে তানভিরের কাছেই আবিরের ফোন ছিল। তানভির আবিরের মাথার পাশে ফোনটা রেখে বেড়িয়ে গেছে। রাকিব ও চলে গেছে, বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। তানভির পার্টি অফিসের সামনে আসতেই দেখল, ভেতরে কয়েকজন কোনো বিষয় নিয়ে তর্কাতর্কি করছে। তানভির দ্রুত ভেতরে গেল। আজ থেকে ১৫ দিন আগে সংগঠিত এক পোগ্রামের ছোট খাটো ভুল ভ্রান্তি নিয়ে ২-৪ জন কথা বলছিল। সেটা এক পর্যায়ে তর্কে রূপ নিয়েছে। তানভির প্রথমে শান্ত থেকে থামানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু কারো থামার নাম নেই। অল্প বয়সে সবার রক্ত ই গরম থাকে। কারো মুখ থেকে সামান্য তম কথাও কেউ সহ্য করতে পারে না। বেসামাল পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তানভির উচ্চস্বরে ধমক দিতেই সকলে নিরব হয়ে গেছে। সময়টা যেন থমকে গেছে। সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। আবিরের বলা কথাগুলো মনে করে, তানভির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সাবলীলভাবে বুঝানোর চেষ্টা করলো। সবাইকে থামিয়ে তানভির নিজের চেয়ারে মাথা চেপে ধরে বসে আছে৷

গতকাল থেকে তানভিরের মেজাজ এমনিতেই খুব গরম, মেঘের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ, আবিরের এক্সিডেন্ট, মিনহাজ আর তামিমের প্রতি তীব্র আক্রোশে তানভিরের মেজাজ তুঙ্গে। তানভিরের নিজের বোনের প্রতি যতটা না ক্ষোভ ছিল তার চেয়ে বেশি রাগ হয়েছিল বন্যাকে সেখানে উপস্থিত থাকতে দেখে। বন্যার ম্যাচিউরিটি তানভিরকে বরাবরই মুগ্ধ করে। মেয়েটা কখনোই উশৃংখল আচরণ করে না, করলেও সেটা নির্দিষ্ট গন্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে। যেমন - মেঘদের সাথে থাকলে বন্যা ওদের মতোই দুষ্টামি, ফাজলামো করে। আবার বাড়িতে থাকাকালীন ছোট ভাইয়ের সাথে খুনসুটিতে মেতে থাকে অথচ স্যার-ম্যাম, তানভির, আবির কিংবা বড়দের সামনে একদম শান্তশিষ্ট ভাবে কথা বলে। বন্যার কথা আর আচরণ কোথাও কোনো প্রকার অভদ্রতার ছোঁয়া নেই। মেয়েটার রাগ বুঝারও কোনো উপায় নেই। গতকালের ঘটনায় বন্যার উপস্থিতি দেখে তানভির নিজেকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না। আবির আর তানভির দুজনের দৃষ্টিতেই বন্যা মেঘের তুলনায় অনেকটায় পরিণত। কাউকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করলে, খুব করে কিছু আশা করে না পেলে তখন বুকের ভেতর যে আঘাত টা লাগে সেটা এত সহজে মুছে না। তানভিরের ক্ষেত্রেও এমনটায় হয়েছে। বন্যার প্রতি তানভিরের অন্ধ বিশ্বাস ছিল, বন্যা মেঘের সাথে থাকলে মেঘ কখনো ভুল বা অন্যায় কিছু করবে না। সেই বিশ্বাসটা বন্যা নষ্ট করে দিয়েছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বাধ্য হয়ে রাতে বন্যার উপর নিজের রাগ ঝেড়েছে। যদিও পরে সবটায় জেনেছে কিন্তু তখন কল দেয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না। বন্যাকে ফোন দিবে ভাবতেই, পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট হতে শুরু করল। পকেট থেকে ফোন বের করতেই বন্যার নাম টা ভেসে উঠল। ওমনি তানভিরের ওষ্ঠপুট প্রশস্ত হলো। মাথা যন্ত্রণা, মনের অশান্তি যেন মুহুর্তেই গায়েব হয়ে গেছে। ফোন রিসিভ করে তানভির মোলায়েম কন্ঠে বলল,

"আসসালামু আলাইকুম "

বন্যা ভয়ে ভয়ে বলল,

"ওয়ালাইকুম আসসালাম। আবির ভাইয়া কেমন আছেন?"

"আলহামদুলিল্লাহ ভালো। শুধু হাতে পায়ে আর মাথায় ব্যান্ডেজ করা তবে বিন্দাস আছে। "

"Sorry"

"ওমা, সরি বলছো কেন?"

"এমনি। ভাইয়া কি এখনও হাসপাতালে? "

"হ্যাঁ কালকে সম্ভবত বাসায় নিয়ে যেতে পারবো।"

"মেঘ কোথায় ?"

"হাসপাতালেই আছে। "

"আপনি কোথায়?"

"আমি পার্টি অফিসে আসছি। তুমি কি করতেছো?"

"ভার্সিটিতে আসছি৷ মেঘ কি আজ বাসায় যাবে না? ও মনে হয় বাসায় ফোন রেখে আসছে। কথা বলতে পারছি না। "

"আমি হাসপাতালে গিয়ে বনুকে ফোন দিব নে। তখন কথা বলে নিও। "

"আচ্ছা। আর একটা কথা জিজ্ঞেস করবো? "

"তোমার বন্ধুদের কথা বাদ দিয়ে যা ইচ্ছে জিজ্ঞেস করতে পারো। "

বন্যার মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। গতরাতেই তানভির নিষেধ করেছিল । কিন্তু ভার্সিটিতে এসে দুই বন্ধুকে না পেয়ে বন্যার মনটা খুঁত খুঁত করছে। তাই তানভিরকে জিজ্ঞেস করবে ভেবেছিল, অথচ তানভির আগে থেকেই সাবধান করে ফেলছে৷

বন্যা ধীর কন্ঠে বলল,

" আচ্ছা রাখি এখন।"

"কি যেন জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলে?"

"কিছু না। ভালো থাকবেন।"

তানভির মুচকি হেসে বলল,

"তুমিও ভালো থেকো। আর কোনো সমস্যা হলে জানিয়ো৷"

বন্যা কল কাটতে কাটতেই ঘুরতে নিলে আচমকা এক ছেলের সঙ্গে ধাক্কা লাগতে যাচ্ছিলো। ছেলেটা দ্রুত সরে গিয়ে ভারী কন্ঠে বলল,

"এইযে খুকি, কানা নাকি? দেখে চলতে পারো না? "

বন্যা ফোন কানে নিয়েই চোখ তুলে তাকালো। ছেলেটা বেশ ফর্সা, বন্যার তুলনায় হাইট অনেকটায় বেশি, চোখে সাদা গ্লাস, চুল গুলো গুছানো, পড়নে শার্ট তার উপর অ্যাপ্রন। বন্যা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকালো। ছেলেটা বিপুল চোখে বন্যার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। তানভির ফোনের ওপাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠে শুধালো,

" কে ধমক দিয়েছে?"

বন্যা ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,

"চিনি না। রাখছি এখন।"

ছেলেটা কয়েক মুহুর্ত স্থির থেকে বন্যার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চলে যাচ্ছে। বন্যাও সূক্ষ্ম নেত্রে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটার চাল চলনের হঠাৎ পরিবর্তন দেখে বন্যার মনে খটকা লাগছে৷ তাছাড়া বন্যা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখান দিয়ে সচরাচর কেউ হাঁটাচলাও করে না৷ তবে ঐ ছেলে কেন এদিকে আসবে। ছেলেটাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে ক্লাসের দিক থেকে সিনিয়র হবে, কিন্তু আগে কখনো এই ছেলেকে দেখেছে কি না সেটা মনে করতে পারছে না৷ ছেলেটা অনেকটা দূরে চলে গেছে, বন্যা আবারও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। বন্যার হঠাৎ ই মিনহাজের সাথে প্রথম দেখার ঘটনা মনে পরে গেছে। মিনহাজ ইচ্ছেকৃত ধাক্কা দিতে এসে নিজেই যেমন ভাব নিয়েছিল, তেমনি এই ছেলেও নিজে অন্য রাস্তায় এসে আবার ধমক দিয়ে বসলো। বন্যার এখন নিজের উপর বড্ড রাগ হচ্ছে। একটু আগে বিষয়টা খেয়াল করলে ছেলেটাকে অন্ততপক্ষে দুটা কথা বলতে পারতো। তানভির পুনরায় কল করছে। বন্যা কল রিসিভ করা মাত্রই তানভির আতঙ্কিত কন্ঠে শুধাল,

"কি হয়েছে? কে কি বলছে?"

" তেমন কিছু না।"

"সত্যি কথা বলো! আসবো আমি?"

"আরে না। সত্যি কিছু হয় নি। আপনার আসতে হবে না। "

"Are you sure?"

"Yes. "

"ঠিক আছে। ক্লাস শেষ করে বাসায় চলে যেও। "

"জ্বি আচ্ছা। রাখছি৷"

বন্যা কল কেটে আবারও তাকালো, ততক্ষণে ছেলেটা কোথায় যেন চলে গেছে। এরমধ্যে লিজা আর মিষ্টি এসে বন্যার মাথায় গাট্টা মেরে উত্তেজিত কন্ঠে প্রশ্ন করল,

"কিরে তুইও কি লিফাত ভাইয়ার প্রেমে পরছিস?"

বন্যা কপাল কুঁচকে রাশভারী কন্ঠে শুধালো,

"লিফাত ভাইয়া আবার কে?"

লিজা হেসে উত্তর দিল,

" এইযে একটু আগে যার সাথে কথা বলছিলি, যার দিকে এইমাত্রও তাকিয়ে ছিলি তিনি হচ্ছেন লিফাত ভাইয়া। ৪র্থ বর্ষের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের ফার্স্ট বয়। ওনি যে কত মেয়ের ক্রাশ তার কোনো হিসেব নেই! এমনকি আমারও ক্রাশ। তা কি কথা বলছিলি রে?"

বন্যা রেগে বলল,

"কোনো কথায় বলি নি। তোর ক্রাশের সাথে কথা বলতে আমার বয়েই গেছে। আর একটা কথা, তোর ক্রাশের ক্যারেক্টারে সমস্যা আছে, বুঝলি!"

লিজা দাঁতে দাঁত চেপে কটকট করে বলল,

"তুই আমার ক্রাশকে নিয়ে একদম বাজে কথা বলবি না। "

"বলতে চাই ও না। এমনকি তোদের সাথেও কথা বলতে চাই না। বাই"

বন্যা ক্লাসে চলে গেছে। বন্যার পিছু পিছু মিষ্টি আর লিজাও ছুটছে।এদিকে আলী আহমদ খান চলে যাওয়ার পর আরও ২-৩ ঘন্টা মাহমুদা খান হাসপাতালে ছিলেন, আবিরকে যতটা সম্ভব বুঝিয়েছেন। মালিহা খান আজ কম বেশি কথা বলেছেন, হালিমা খানের সাথেও পরিচিত হয়েছেন। প্রায় ১ টার দিকে ওনারা বাসার উদ্দেশ্যে চলে গেছেন। মালিহা খান আর হালিমা খান দুজনেই বাসায় যাওয়ার জন্য বলেছেন কিন্তু প্রতিত্তোরে মাহমুদা খান কিছুই বলেন নি। এত বছরের দূরত্বের পর হুট করে ঐ বাড়িতে চলে যাওয়া ওনার কাছেও স্বাভাবিক বিষয় না। এই বাড়ির সাথে জড়ানো আবেগগুলো কেমন যেন শক্ত পাথরে মুড়িয়ে আছে। সেই পাথর না গললে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে উঠা অসম্ভব ব্যাপার। আলী আহমদ খান মুখরক্ষার খাতিরে বোনকে বাসায় যেতে বললেও দুই ভাবি খুব আন্তরিকতার সহিত বাসায় যাওয়ার জন্য বলেছেন। দুপুরের পর পর ই ইকবাল খান, আকলিমা খান, মীম, আদি হাসপাতালে আসছে৷ আবিরের অসুস্থতার কথা তানভির বলতে চাই নি, তবে ইকবাল খান বার বার জোর করায় বাধ্য হয়ে বলেছেন। বলতে দেরি হলেও তাদের রওনা দিতে দেরি হয় নি। মীম আর আদি সারা রাস্তা কেঁদে কেঁদে এসেছে। আবিরের সাথে মীম খুব কম কথা বলে, হুটহাট দেখা না হলে মীম ইচ্ছেকৃত সামনেও পরে না। তবে ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসার কোনো কমতি নেই তার। অন্যদিকে আদির আবদার করার একমাত্র জায়গায় আবির। বাহিরে থাকাকালীন ও ভিডিও কল দিয়ে প্রতিনিয়ত বলতো, ভাইয়া এটা নিয়ে এসো, ওটা নিয়ে এসো, কবে আসবা! এখনও তাই করে। হাসপাতালে এসে আবিরের অবস্থা দেখে দুই ভাই বোন ই থ মেরে গেছে। মাথায়, হাতে, পায়ে ব্যান্ডেজ দেখে আঁতকে উঠল। এমন অবস্থায় বাস্তবে কাউকে দেখেনি তারা, এই প্রথমবার আবিরকে দেখছে। আকলিমা খান ও অনেক বেশি আতঙ্কিত হয়েছেন, আবিরকে দেখেই আর্তনাদ শুরু করেছেন। ইকবাল খান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কিছুই বলতে পারছেন না। ওনার চোখে ভেসে উঠেছে বহু বছর আগে আলী আহমদ খানের এক্সিডেন্টের পরের দৃশ্য। তখন আলী আহমদ খান এক্সিডেন্ট করে প্রায় ৬ মাস বিছানায় ছিলেন। একই রূপে নিজের ভাইপো কে কখনো দেখতে হবে এটা ইকবাল খান কখনো কল্পনাও করেন নি। ইকবাল খান তাড়াতাড়ি আবিরের রিপোর্ট চেক করতে লাগলেন, হাত পায়ের অবস্থা বুঝার জন্য। মাথায় চাপ বেশি খেলেও হাতে আর পায়ে খুব বেশি সমস্যা নেই। ২১ দিন বেডরেস্টে থাকলে আশা করা যায় ঠিক হয়ে যাবে।

দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যে হতে চললো। দুপুরে সবাই অল্পস্বল্প খেয়েছে কিন্তু মেঘ কিছুই খায় নি। সেই যে আবিরের পায়ের কাছে বসেছিল সারাদিন যাবৎ সেখানেই বসে আছে। দু'হাতে দুই হাঁটু আঁকড়ে ধরে হাঁটুর উপর কাত করে মাথা রেখে অমত্ত আঁখিতে আবিরের অভিমুখে চেয়ে আছে। নাক অব্দি ওড়না টানা, আঁখি যুগল স্থির, প্রয়োজনের বাহিরে একবারের জন্যও পলক ফেলছে না৷ কখনো কখনো চোখের কার্নিশ দিয়ে অনর্গল গড়িয়ে পড়ছে নোনাজল। অতি সন্তর্পণে চোখের পানি মুছে আবারও চেয়ে আছে আবিরের দিকে। সারাদিনে "খাব না" ব্যতীত মেঘের মুখ থেকে আর কোনো কথা বের হয় নি। সকাল থেকেই আবির ক্ষণে ক্ষণে মেঘকে দেখছে কিন্তু আজ তার কিছু বলার সামর্থ্য নেই। আম্মু, মামনির সামনে মেঘকে যে দুটা কথা বলবে সেই পরিস্থিতিও নেই। কেউ আবিরের পাশ থেকে উঠে যাচ্ছেও না।

 বিকেলে হালিমা খান , আকলিমা খানদের সাথে সাথে বাসায় গিয়ে রাতের জন্য রান্না করে সন্ধ্যায় আবারও হাসপাতালে আসছেন, ইকবাল খান সাথে আসছেন। আলী আহমদ খান ও অফিস থেকে সরাসরি হাসপাতালে আসছেন। মালিহা খান আর মেঘ দু'জনেই সারাদিন হাসপাতালে ছিল। আবির ঘুমাচ্ছে দেখে কেউ ডাকে নি৷ হালিমা খান এসে থেকে মেঘকে খাওয়ানোর চেষ্টা করেছেন। আলী আহমদ খান নিজেও ২ বার খাওয়ার কথা বলেছেন কিন্তু মেঘ নিশ্চুপ বসে আছে। বাধ্য হয়ে হালিমা খান তানভিরের নাম্বারে কল দিয়েছে। তানভির কল রিসিভ করতেই হামিলা খান বিরক্তি ভরা কন্ঠে বললেন,

"কোথায় তুই?"

তানভির উত্তর দেয়ার আগেই হালিমা খান পুনরায় বলে উঠলেন,

"যেখানেই থাকিস হাসপাতালে এসে তোর বোনকে খাইয়ে রেখে যা। আমি তোর বোনের সাথে আর পারব না!"

"আচ্ছা আসতেছি। তুমি কিন্তু বনুর সাথে রাগারাগি করো না।"

"তোর আর তোর বাপের আদরে মেয়েটা দিন দিন আরও বেশি জেদি হইতেছে। "

"আমি এখনি আসতেছি"

২০ মিনিটের মধ্যে তানভির হাসপাতালে আসছে। মেঘ তখনও গুটিশুটি মেরে বসে আছে। তানভির ঢুকতেই মেঘ নড়েচড়ে বসল। তানভির ভারী কন্ঠে বলল,

"খাচ্ছিস না কেন?"

"খিদে নেই। "

"বললেই হলো"

তানভির প্লেটে খাবার বেড়ে মেঘের সামনে ধরতেই মেঘ খাব না বলে তানভিরের দিকে তাকালো। তানভিরের অগ্নি দৃষ্টি দেখে মেঘ কিছু বলার সাহস পেল না৷ চুপচাপ খাওয়া শুরু করল। তানভিরও মেঘের সামনে চেয়ার নিয়ে বসে আছে। তানভির চাইলেও মেঘকে কিছু বলতে পারছে না, আবার না বলেও থাকতে পারছে না। কারণ মেঘের এরকম আচরণ বাসার মানুষের চোখে সন্দেহের সৃষ্টি করবে। সবাই যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল এই ফাঁকে তানভির দু একবার মেঘকে বাসায় যাওয়ার কথা বলেছে, ঠান্ডা মাথায় বুঝিয়েওছে কিন্তু মেঘ মাথা দিয়ে না করেই যাচ্ছে। তানভির যখন বুঝতে পেরেছে মেঘকে রাজি করানো সম্ভব না তখন বাধ্য হয়ে মালিহা খানকেও থাকতে বলেছে। মেঘ, মালিহা খান আর তানভির ছাড়া বাকিরা বাসায় চলে গেছে। রাকিব অফিস শেষে হাসপাতালে আসছে তবে মালিহা খান উপস্থিত থাকায় কেউ কোনোপ্রকার উল্টাপাল্টা কথা বলছে না। তানভির আর রাকিব কিছুক্ষণ বসে তারপর বেড়িয়ে গেছে। অনেকক্ষণ পর তানভির ২ কাপ চা নিয়ে রুমে আসছে। এককাপ মালিহা খান আরেক কাপ মেঘকে দিয়ে তানভির নিজের ফোনটা মেঘকে এগিয়ে দিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

" তোর বান্ধবীর সাথে একটু কথা বলিস"

মেঘ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে গতকালের ঘটনা গুলো ভাবছে আর মনে মনে নিজেকে বকা দিচ্ছে। গতকাল হাসপাতালে আসার পর থেকে মেঘের মস্তিষ্কে আবির ভাই ব্যতীত আর কেউ নেই। দু এক বার বন্যার কথা মনে হলেও ফোন বাসায় ফেলে আসায় কল দিতে পারছিল না। মেঘ চা শেষ করে রুম থেকে বেরিয়ে বন্যাকে কল দিয়েছে।

মেঘ- আসসালামু আলাইকুম।

বন্যা- ওয়ালাইকুম আসসালাম। কিরে কেমন আছিস? শুনলাম আবির ভাইয়া এক্সিডেন্ট করছেন, এখন কেমন আছেন?

মেঘের গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। বন্যা শান্ত স্বরে বলল,

"এই মেঘ, কাঁদছিস কেন?"

মেঘ কাঁদতে কাঁদতে বলল,

"আজ আমার জন্য আবির ভাইয়ের এই অবস্থা হয়েছে। আমি কেন এমন করলাম! আমি এত বোকা কেন, বন্যা? "

বন্যা মোলায়েম কন্ঠে বলে উঠল,

"তুই বোকা না তোর মনটা খুব অস্থির। থাক কাঁদিস না। ভাইয়া এখন কেমন আছেন বল"

"ডাক্তার ২১ দিন বেডরেস্টে থাকতে বলছেন। ২১ দিন পর আবার টেস্ট করলে বুঝা যাবে ঠিক হয়েছে কি না। "

"কালকে নাকি বাসায় নিয়ে যাবে?"

"হ্যাঁ। কিন্তু.. "

"কিন্তু কি?"

" ওনি গতকাল থেকে আমার সাথে কোনো কথা বলছেন না। হঠাৎ চোখে চোখ পরলেও সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নেন৷ আমি কি করবো এখন"

"ওনার রাগ করাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এক ছেলের সাথে খেলছিলি বলে ক্লাস ৫ এ থাকাকালীন যে লোক তোর গালে থাপ্পড় মারতে পারেন সেখানে তুই এক ছেলেকে ভালোবাসিস বলার পর কিভাবে ভাবিস পরিস্থিতি শান্ত থাকবে।"

"ওনি আমায় থাপ্পড় মারলেও আমি এতটা কষ্ট পেতাম না। যতটা কষ্ট এখন হচ্ছে। নিজের উপর আর মিনহাজদের উপর এত রাগ হচ্ছে... "

"এখন অন্ততপক্ষে শান্ত থাকিস প্লিজ, আর কোনো ভুল করিস না। তোর ভাই মিনহাজদের যা করার করে ফেলছে। "

"মানে?"

"গতকাল থেকে মিনহাজদের কোনো খোঁজ নেই, ফোন বন্ধ, আজ ক্লাসেও আসে নি। তোর ভাই বলছে ৩ দিন পর নাকি ওদের খোঁজ পাবো। আমাকে এই বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে নিষেধ করেছেন। "

"কি বলছিস এসব!"

"ঠিকই বলছি। তুই ভুলেও এই প্রসঙ্গে কিছু বলিস না।গতকাল থেকে তোদের টেনশনে আমি ঘুমাতে পারছিলাম না। "

মেঘ আর বন্যা প্রায় ৩০-৪০ মিনিট কথা বলার পর ফোন রেখে তানভিরকে ফোন দিয়ে আসছে। কোনোরকমে রাত কাটিয়ে সকাল থেকেই আবিরকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় লেগেছে। ডাক্তার চেকাপ করে রিলিজ দেয়া মাত্রই বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে৷ এ অবস্থায় সিঁড়ি দিয়ে উঠা নামা করতে সমস্যা হবে বিধায় আবিরের জন্য নিচের একটা গেস্ট রুম গুছানো হয়েছে। আপাতত কিছুদিন এখানেই থাকবে, পা ঠিক হলে উপরে চলে যাবে। মেঘও নিজের রুমে চলে গেছে। আবিরের দিকে যতবার তাকায় ততবারই মেঘের নিজের প্রতি ঘৃণা হয়। মেঘ বাসায় ফিরে সেই যে রুমে ঢুকেছে সন্ধ্যার পর হয়ে গেছে অথচ মেঘ একবারের জন্যও নিচে আসছে না। আদি ২-৩ বার দরজা পর্যন্ত গিয়ে মেঘকে ডেকে এসেছে, কিন্তু মেঘ আসে না। বাধ্য হয়ে মীম মেঘের রুমে গেল৷ দরজার সামনে থেকে "আপু" বলে ডাকতে ডাকতে ভেতরে ঢুকলো। মেঘ টেবিলের উপর দু'হাতে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে। চুল এলোমেলো থাকার কারণে মেঘের মুখ দেখার অবস্থা নেই। মীম কাছে এসে ডাকল,

"আপু!"

মীম কয়েক মুহুর্ত পরই বুঝতো পারল মেঘ ফুঁপাচ্ছে। মীম যথাসাধ্য মেঘের চুলগুলো ঠিক করতে করতে মলিন স্বরে বলল,

"আপু তোমার কি হয়েছে? কাঁদতেছো কেন?"

মেঘের কান্নার তীব্রতা বাড়ছে। আরও বেশি ফুঁপাচ্ছে, মীম আতঙ্কিত কন্ঠে মেঘকে ডাকতে লাগলো। মেঘ অনেকক্ষণ পর মুখ তুলে তাকালো। কান্নার তোপে মেঘের মুখ লাল টকটকে হয়ে গেছে। চোখ বেয়ে অনর্গল পানি পরছে। বাঁধহীন এই জলের ধারার কোনো অন্ত নেই। মীম অবুঝ মেয়ের মতো চেয়ে আছে, প্রশ্ন করার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। মেঘ আচমকা মীমকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। মীমের মন ব্যাকুল হয়ে আছে, অনেকক্ষণ পর মৃদুস্বরে শুধালো,

"আপু কাঁদছো কেন? কি হয়েছে তোমার? প্লিজ বলো আমাকে "

মেঘ কাঁদতে কাঁদতে বলা শুরু করল,

" আমি আবির ভাইকে অনেক ভালোবাসি৷ আমার নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি। ওনার অস্তিত্ব ব্যতীত আমি আমার সত্তা কল্পনা করতে পারি না। আমার সামান্য ভুলের কারণে আজ আবির ভাইয়ের এই অবস্থা।আমি নিজকে ক্ষমা করতে পারবো না রে। "

বিস্ময়ে মীমের চোখ তিনগুণ বড় হয়ে গেছে। মীম আশ্চর্যান্বিত নয়নে তাকিয়ে ব্যস্ত কন্ঠে বলল,

"তুমি আবির ভাইয়াকে ভালোবাসো?"

"হুমমমমমমম।"

"কবে থেকে?"

"দেশে আসার পর থেকেই।"

মীম আর্তনাদ করে উঠল,

"তুমি আমাকে এতদিনে বলতেছো!"

মেঘ কাঁদতে কাঁদতে বলল,

"আমি এখন কি করব? ওনার সামনে যাওয়ার সাহস পাচ্ছি না। "

"কেন? তুমি কি ভাইয়ার মাথা ফাটাইছো নাকি?"

"আমার জন্যই ওনি এক্সিডেন্ট করেছেন।"

" হ্যাঁ বলছে তোমায়! ভাইয়ার কপালে এক্সিডেন্ট লেখা ছিল তাই করেছেন। চলো তো!"

"নাহ। আমি যাব না। "

মীম দুহাতে মেঘের চোখের পানি মুছে শক্ত কন্ঠে বলল,

"চলো আমার সঙ্গে। আমিও একটু দেখি ভাইয়ার সাথে তোমায় কেমন মানায়!"

মেঘ সিক্ত আঁখিতে তাকিয়ে মলিন হাসলো। মীম টানতে টানতে মেঘকে নিয়ে যাচ্ছে। মীমের টানের কারণে মেঘের আধখোলা চুল সম্পূর্ণ খুলে গেছে। আদুরে রূপ কেমন যেন ফ্যাকাশে দেখা যাচ্ছে । মীম মেঘের হাত ধরে টানতে টানতে সিঁড়ি এসেই চিন্তিত কণ্ঠে বলল,

"আপু একটা প্রশ্ন করি?"

মেঘ স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

"কি?"

"তোমার আর আবির ভাইয়ার বিয়ে হলে আমি তোমাকে কি ডাকবো? আর আবির ভাইয়াকেই বা কি.. "

কথা সম্পূর্ণ করার আগেই মেঘ একহাতে মীমের মুখ চেপে ধরে রাগী স্বরে বলল,

"ভুলেও যদি বাসার কারো সামনে এ ধরনের কথা বলিস না, খু*ন করে ফেলবে আমায়।"

"কেন?"

"পরে বলবো।"

"আচ্ছা ঠিক আছে।"

মীম আর মেঘ আবিরকে দেখার জন্য ড্রয়িংরুম পেরিয়ে গেস্টরুমে আসছে। দরজায় দাঁড়িয়ে মীম হালকা করে কাশি দিল৷ আবির তখন পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে ফোন দেখছিল, ফোনের স্ক্রিন জুড়ে আবিরের কাদম্বিনীর এক উজ্জ্বল ধৃষ্টতার বিচরণ । মুখে তার মিষ্টি হাসি, ডাগর ডাগর আঁখি জোড়া তাতে গাঢ় করে কাজল রেখা টানা, আবির নেশাক্ত দৃষ্টিতে সেই ছবিটা দেখছিল। ছবির মালিক বহুবছর আগেই আবিরের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। অকস্মাৎ শব্দ হওয়ায় আবিরের ধ্যান ভেঙ্গেছে। মুহুর্তেই ফোন রেখে চোখ তুলে তাকালো। সরাসরি নজর পরে মীমের দিকে, সূক্ষ্ম নেত্রে তাকাতেই মীমের পেছনে মেঘকে দেখতে পেল।

মীম দরজা থেকে বলল,

"ভেতরে আসবো, ভাইয়া?"

"আয়"

মীম মেঘকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো৷ মেঘ চিবুক গলায় নামিয়ে রেখেছে। মীম টুকটাক কথা বলেছে কিন্তু মেঘ মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে আছে। মেঘের নিরবতা আবিরেরও সহ্য হচ্ছে না তাই বাধ্য হয়ে মীমকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"আম্মুকে বল আমায় খাবার দিতে ।"

মীম "আচ্ছা" বলে মেঘের হাত ছেড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেছে। আবির কয়েক মুহুর্ত মেঘের দিকে তাকিয়ে রইলো, কতক্ষণ যাবৎ মেঘকে দেখছে তার হিসেব নেই। হঠাৎ রাশভারি কন্ঠে বলল,

" সারাদিন শেষে এতক্ষণে আমার কথা মনে পরলো?"

মেঘ মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে আছে। থরথর করে হাতপা কাঁপছে। আবির বারবার সূক্ষ্ণ নেত্রে মেঘের দিকে তাকাচ্ছে। হঠাৎ মোলায়েম কন্ঠে শুধালো,

"কি হয়েছে তোর?"

মেঘ কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,

"I am Sorry Abir Vai"

"সরি কেন?"

"আপনার এই অবস্থার জন্য আমি দায়ী!"

আবির চোখ ঘুরিয়ে এদিক সেদিক তাকিয়ে ঠাট্টার স্বরে বলল,

" কেন? তুই পেত্নী সেজে আমাকে ধাক্কা মারছিলি নাকি?"

আবিরের এমন কথা শুনে মেঘ সহসা চোখ তুলে তাকালো। আবিরের মুখে হাসি দেখে মেঘ কপাল কুঁচকে আহাম্মকের মতো চেয়ে আছে। আবির মৃদু হেসে বলল,

"এখানে বস এসে"

মেঘ চুপচাপ এসে বসলো। কিছুক্ষণ নিরব থেকে মেঘ আবারও কান্না শুরু করে দিয়েছে, মেঘের কান্না দেখে আবির থতমত খেয়ে গেছে। তড়িঘড়ি করে বলল,

" এইইইই, আর কত কাঁদবি! দুদিন যাবৎ কেঁদেই যাচ্ছিস। এবার অন্তত থাম প্লিজ।"

মেঘের কান্না থামার কোনো লক্ষণ না দেখে আবির গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,

"এভাবে কেঁদে কি প্রমাণ করতে চাস?"

"মানে?"

" আমি তোকে মারি, তোকে কাঁদায় এসবই প্রমাণ করতে চাস? "

"নাহ।"

"তাহলে এভাবে কাঁদছিস কেন? আমি কি মরে গেছি?"

মেঘ সঙ্গে সঙ্গে আবিরের মুখ চেপে ধরে হুঙ্কার দিয়ে উঠল,

" আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি, ম*রার কথা কখনো মুখে নিবেন না।"

আবির আলতো ভাবে মুখে রাখা মেঘের হাতের উপর হাত রেখে হাতটা কিছুটা সরিয়ে ঠোঁটে হাসি রেখে বলল,

" আর তুই যে এভাবে কাঁদছিস সে বেলায়?"

মেঘ কাঁদতে কাঁদতে আবারও বলতে শুরু করল,

" আমি ভুল করেছি, আমায় মাফ করে দেন প্লিজ, আমি আর কখনও এমন কাজ করব না। মিনহাজদের সঙ্গে আর কখনো কথা বলবো না, কারো সাথেই মিশবো না। "

আবির রাগান্বিত কন্ঠে বলল,

" ভুল তুই না বরং আমি করেছি। আমার সেদিন বড় ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করা উচিত ছিল।"

মেঘ চিৎকার করে উঠল,

"মানে?"

" আমার উচিত ছিল সামনে দাঁড়িয়ে মিনহাজের প্রপোজ করার স্টাইলটা দেখা। তাকে সাপোর্ট করা। আমার আসলে ঐ ভাবে রিয়েক্ট করা ঠিক হয় নি। সরি। আমি সুস্থ হলে তাকে বলিস আবার তোকে প্রপোজ করতে।"

"জীবনেও না। আমি আর কথায় বলবো না। আর আপনি প্লিজ আজেবাজে কথা বলবেন না।"

"আজবাজে কথা কি বললাম?"

"কিছু না।"

  এমনসময় মীম খাবার নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। আবিরের হাতে মেঘের হাত দেখে মীম জোড়ে গলা খাঁকারি দিয়ে,

"আমি কি আসতে পারি?"

আবির তড়িঘড়ি করে মেঘের হাত ছেড়ে দিল, মেঘও কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে। মীম খাবার টেবিলে রেখে যেতে যেতে ঠাট্টার স্বরে বলল,

"আমি এখন চলে যাচ্ছি, পরে আবার আসবো কিন্তু। "

মেঘ টেবিল থেকে প্লেট নিয়ে আবিরের দিকে এগিয়ে ধরল। খাইয়ে দিবে নাকি আবির ভাই নিজে নিজে খেতে পারবেন এ নিয়ে কনফিউশানে পরে গেছে।

আবির ভ্রু কুঁচকে ভারী কন্ঠে বলল,

" খাইয়ে দে।"

মেঘ ঢোক গিলে উষ্ণ স্বরে শুধালো,

"আমি খাইয়ে দিব ?"

" আশেপাশে কি আমার বউকে দেখতে পাচ্ছিস? পেলে আমার বউকে প্লেটটা দে, সে ই না হয় খাইয়ে দিবে। "

মেঘ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে রাগী স্বরে বলল,

"হয়েছে। বউকে খোঁজতে পারব না। সারাদিন বউ বউ করলে আমি বড় আব্বুর কাছে বিচার দিব।"

"কি বিচার দিবি?"

"বলবো আপনি পাগল হয়ে গেছেন।"

"বলিস, আমিও বলবো। "

"কি বলবেন?"

"তোকে যে রাস্তাঘাটে মানুষ প্রপোজ করে বেড়ায় সেটায় বলবো।"

"আমাকে প্রপোজ করে নি, আর যদি করেও তাতে আপনার কি! আপনার মতো না তো! আপনি যে গোপনে বউ বাচ্চা রেখেছেন! "

"তারমানে আমার বউ, বাচ্চা আছে এটা তুই মেনে নিচ্ছিস?"

"নাহ। জীবনেও মানবো না। "

আবির হেসে বলল,

" এখন কি খাওয়াবেন?"

"হুমমমমম।"

মেঘ আবিরকে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে। ফাঁকে ফাঁকে আবির ফুপ্পির বিষয় নিয়ে টুকিটাকি কথা বলেছে। এখন বাসায় আনলে ঠিক হবে কি না, কিভাবে আনবে সেসব বিষয়েই কথা বলেছে। মেঘের খাওয়ানো শেষে চলে যেতে নিলে মীম আবারও ছুটে আসছে। মিটিমিটি হেসে বলল,

"এত তাড়াতাড়ি খাওয়ানো শেষ?"

মেঘ মীমের মাথায় গাট্টা মেরে রাগী স্বরে বলল,

"রুমে চল, তোর ঠোঁট দুটা সেলাই করতে হবে।"

মীম হেসে আবিরকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"ভাইয়া এখন ঘুমাও তুমি। আমরা চলে যাচ্ছি।"

মেঘরা যাওয়ার কিছুক্ষণ পর আলী আহমদ খান আবিরকে দেখতে রুমে আসছেন, সাথে মালিহা খানও এসেছেন। আবির আলী আহমদ খানকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"আব্বু একটা কথা বলব?"

"বলো"

" আপনি কি ফুপ্পিকে বাসায় আনতে চাচ্ছেন?"

"আমি আসতে বলেছি, তার ইচ্ছে হলে আসবে।"

"এভাবে বললে ফুপ্পি কোনোদিনও আসবে না। ভুলে যাবেন না ওনি আপনার ই বোন। আপনি যদি সত্যি চান ফুপ্পি বাসায় আসুক, তাহলে ফোন দিয়ে ভালোভাবে দাওয়াত দেন। ফুপ্পিদের বাসার সবাইকে নিয়ে আসতে বলুন। আর যদি না চান তবে ভবিষ্যতে মুখ রক্ষার্থে কখনো দাওয়াত দিবেন না, প্লিজ। "

■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■

#Ch.52 (প্রথমাংশ)

আলী আহমদ খান গুরুভার কন্ঠে বললেন,

"তোমার ফুপ্পিকে আসতে বলেছি প্রয়োজনে আবার বলবো কিন্তু তোমার ফুপাকে কিছু বলতে বলো না আমায়। এই একটা মানুষের জন্য আমার পরিবারটা ধ্বংস হয়ে গেছে তাকে কখনো ক্ষমা করতে পারবো না আমি৷ "

মালিহা খান ঠান্ডা কন্ঠে বললেন,

"আর কতদিন মনের ভেতর বিদ্বেষ পুষে রাখবেন। এবার অন্ততঃ সবকিছু ঠিক করে নেন। "

"তোমরা কি চাইছো? আমি নিজে থেকে সব ভুলে ঐ লোকের সাথে কথা বলি?"

আবির তপ্ত স্বরে বলল,

"নাহ। মনের বিরুদ্ধে আপনাকে কিছু করতে বলছি না। আপনি ফুপ্পিকে সত্যিই বাসায় আনতে চাইলে ফুপ্পিকে কল দিয়ে ভালোমন্দ কথা বলে দাওয়াত দিবেন, বাসার সবাইকে নিয়ে আসতে বলবেন। এটুকুই। "

"আমার কাছে ওদের কারো নাম্বার নেই। "

"নাম্বার আমি সংগ্রহ করে দিচ্ছি।"

"আচ্ছা ঠিক আছে দিও।"

সকালবেলা খাবার টেবিলে আবির আর মোজাম্মেল খান ব্যতীত সবাই উপস্থিত। আলী আহমদ খান খাবার শেষ করে স্বাভাবিক কন্ঠে শুধালেন,

" তোমাদের ফুপ্পিকে বাসায় দাওয়াত দিতে চাচ্ছি। এ ব্যাপারে তোমাদের কোনো মতামত থাকলে বলতে পারো। "

খুশিতে গদগদ হয়ে মেঘ বলল,

"কোনো মতামত নেই। ফুপ্পি আসলেই হবে।"

তানভিরের সরল স্বীকারোক্তি,

"আপনার বোনকে আপনি বাসায় আনতে চাচ্ছেন এ ব্যাপারে আমাদের মতামতের থেকেও আপনাদের মতামত টা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আব্বু, আপনি, কাকামনি প্রয়োজনে আম্মুরা আছেন ওনাদের সাথে কথা বলে আপনারা যা সিদ্ধান্ত নেয়ার নিতে পারেন।"

"আমরা আমাদের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাছাড়া তোমার আব্বু আজ আসবে আবশ্যকতায় আবার আলোচনা করবো। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে তারা আসলে তোমরা তাদের সাথে কেমন আচরণ করবে?"

তানভির মৃদু হেসে বলল,

"সে বিষয়ে আপনার টেনশন করতে হবে না। আমি, আমার বোনেরা কিংবা আদি, ওনাদের মনে আঘাত দেয়ার মতো কোনোপ্রকার খারাপ আচরণ করবো না। আপনার এবং এই বাড়ির সম্মান রক্ষার্থে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।"

মীম আর আদিও তানভিরের সঙ্গে তাল মেলালো। মীম আর আদিকে মেঘ অনেকদিন আগে থেকেই ফুপ্পির কথা বলছে। ফুপাতো ভাইবোনদের কথাও বলেছে। তাদের সাথে পরিচিত হতে মীম আর আদিও খুব এক্সাইটেড। মোজাম্মেল খান দুপুরের পরপর বাসায় আসছেন, এসেই সরাসরি আবিরের রুমে চলে গেছেন। আলী আহমদ খানের ছেলের প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসার কারণে আবিরকে কিছু না বললেও মোজাম্মেল খান একায় সেই ঝাঁঝ মিটিয়েছেন। টানা ২ ঘন্টা আবিরের উপর রাগ ঝেড়েছেন, বহুবছর আগে আলী আহমদ খানের এক্সিডেন্টের ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত প্রতিটা ঘটনার নিগূঢ় বর্ণনা দিয়েছেন। হালিমা খান দু একবার থামানোর চেষ্টা করেছেন কিন্তু এতে লাভ হওয়ার বদলে উল্টো ক্ষতি হয়েছে । মোজাম্মেল খানের রাগ আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। তানভির যেমন আবিরের প্রতি কনসার্ন তেমনি মোজাম্মেল খানও বড় ভাইয়ের অতিশয় ভক্ত। আলী আহমদ খানের এত বছরের পরিশ্রম, এই পরিবারের প্রতি অগাধ ভালোবাসা সবটায় মোজাম্মেল খানের খুব কাছ থেকে দেখা। আবির আর তানভির দুজনের ছন্নছাড়া আচরণে আলী আহমদ খান আর মোজাম্মেল খান দু'জনেই অনেক বেশি চিন্তিত। কাজের চাপে আবিরের একটু আধটু সিরিয়াসনেস দেখা গেলেও তানভির বরাবরই গা ছাড়া ভাবে চলে। তারউপর আবির ইচ্ছেকৃত তানভিরকে আরও বেশি আগলে রাখে যা মোজাম্মেল খানের একেবারেই পছন্দ না। আবিরের পাশাপাশি তানভিরও যদি পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে পারিবারিক ব্যবসাটা সামলাতো তাহলে এতদিনে তাদের অবস্থান আরও উপরে থাকতো। একমাত্র ছেলের প্রতি মোজাম্মেল খানের ভালোবাসা যেমন আছে তেমনি দুশ্চিন্তারও অন্ত নেই। আবির পড়াশোনায় ভালো, কাজেও খুব মনোযোগী কিন্তু তানভির সম্পূর্ণ উল্টো। বর্তমানে যা করছে তাতে ও যদি গুরুত্ব না থাকে তবে ছেলের ভবিষ্যৎ কি হবে সেই নিয়েই দুশ্চিন্তা করেন প্রতিনিয়ত। সবকিছুর বহিঃপ্রকাশ ঘটছে আজ আবিরের সামনে। আবির চুপচাপ মাথানিচু করে চাচ্চুর সব কথা শুনছে। আবির চাইলেও এখন কিছুই বলতে পারবে না। একটা কথা বলতে গেলে মোজাম্মেল খান আরও ১০ কথা শুনাবেন তার থেকে বরং চুপ থাকায় শ্রেয়। আবির নিজের মনকে বুঝাচ্ছে,

"আবির আর যাই করিস না কেন, শ্বশুরের সাথে কখনো ত্যাড়ামি করিস না। আবির ধৈর্য রাখতে হবে, ২ ঘন্টা কেন আরও ৩ ঘন্টা বকলেও সহ্য করে নিতে হবে। শ্বশুরকে রাগালে বউকে আর নিজের করে পাবি না। সো বি কেয়ার ফুল আবির। "

এরমধ্যে মেঘ আবিরের জন্য এক গ্লাস দুধ নিয়ে আসছে। আব্বুর রাগ দেখে মেঘের হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। দুধ নিয়ে ভেতরে আসবে নাকি চলে যাবে বুঝতে পারছে না। চলে যাওয়ার জন্য এক পা বাড়িয়ে আবারও দাঁড়িয়ে পরলো।

মেঘ মনে মনে আওড়াল,

"আজ আমার জন্য আবির ভাইয়ের এ অবস্থা। আব্বু ওনাকে একা বকবেন কেন, আমিও তো বকা খাওয়ার অর্ধেক অংশীদার। "

মেঘ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে আবারও রুমের দিকে পা বাড়ালো। কারো উপস্থিতি বুঝতে পেরে মোজাম্মেল খান সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। মেঘের হাতে দুধের গ্লাস থরথর করে কাঁপছে। মেঘ অন্য হাত দিয়ে শক্ত করে গ্লাসটা ধরে রেখেছেন। মোজাম্মেল খান মেঘকে দেখে একটু থামলেন। ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে রাগী স্বরে বললেন,

" তারা এক্সিডেন্ট করে একেক দিন একেকজন পরে থাকবে আর ঘর গুষ্টি মিলে তাদের সেবা করবে। করো করো, আরও বেশি করে সেবা করো। দুধের সাথে আপেল, আঙ্গুর, কলাও নিয়ে আসতা। "

মেঘ একগাল হেসে বলল,

"সব রেডি করা আছে। দুধ খাওয়া শেষ হলেই ঐগুলা নিয়ে আসবো। "

মোজাম্মেল খান তীব্র বিরক্তি আর বিদ্রুপের স্বরে কথাটা বলেছিলেন অথচ মেঘ তা বুঝতে না পেরে উল্টো সাবলীল ভঙ্গিতে অচতুর স্বীকারোক্তি দিয়েছে। মেঘের উত্তর শুনে মোজাম্মেল খান কয়েক মুহুর্ত স্তব্ধ হয়ে রইলেন। মেঘ উত্তর দেয়ার পর নিজেই কনফিউশানে পরে গেছে, আব্বু কি ঠাট্টা করলো নাকি সিরিয়াসলি বলছে এটায় বুঝতে পারছে না । আবির মেঘের অবস্থা দেখে মিটিমিটি হাসছে। মোজাম্মেল খান পুনরায় গম্ভীর কণ্ঠে আবিরকে উদ্দেশ্য কি যেন বলেছেন। মেঘ সে কথা বুঝেছে কি বুঝে নি কে জানে! কপাল কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলল,

" এক্সিডেন্টের কারণে যে পরিমাণ রক্ত শরীর বেড়িয়েছে তা পূরণ করতে দুধ, ডিম, ফল খাওয়াবো না তো কি আপনার বকা খাওয়াবো? "

মোজাম্মেল খান মেঘকে শুধালেন,

"তানভির কোথায়?"

মেঘের চোখ আবিরের দিকে পরতেই দেখল আবির মাথা দিয়ে না করতেছে। মেঘ সহসা মাথা নিচু করে উত্তর দিল,

"জানি না।"

এরমধ্যে হালিমা খান ফল, সাথে ডিম সিদ্ধ নিয়ে আসছেন। রুমে ঢুকতে ঢুকতে চড়া গলায় বললেন,

"তানভির যেখানেই থাকুক অন্তত এখন এখানে তাকে ডাকবো না। ২ ঘন্টা যাবৎ ছেলেটাকে ইচ্ছেমতো কথা শুনাচ্ছেন। আর কত! আপনি এখন যান এখান থেকে। ফ্রেশ হয়ে আসুন আপনাকে খেতে দিচ্ছি। আর ছেলেটাকেও শান্তিতে খেতে দিন।"

তানভির ঘন্টাখানেক আগেই বাসায় আসছে। আবিরের রুমে আসতেও চেয়েছিল কিন্তু হালিমা খান বারণ করেছেন। মোজাম্মেল খানের সামনে আবির আর তানভির দুজনেই গুরুতর আসামি। দোষ যেই করুক না কেন, শাস্তি দু'জনেরই প্রাপ্য। হালিমা খানের উদ্বেল কন্ঠের কথাবার্তা শুনে মোজাম্মেল খান আর কথা বাড়ালেন না। নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন। হালিমা খান আবিরের কাছে ফলের প্লেট টা রেখে মেঘকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

"তুই বরং এখানে থাক। আমি তোর আব্বুর জন্য খাবার রেডি করি।"

মেঘ ঘাড় কাত করে হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানালো। হালিমা খান চলে যেতেই আবির ফলের প্লেটের দিকে তাকালো৷ হিমোগ্লোবিন বাড়ানোর জন্য যে যে ফল বেশি গুরুত্বপূর্ণ সে সব ফলে প্লেট ভর্তি করে নিয়ে আসছে।

আবির ভাবলেশহীন কণ্ঠে বলল,

"এত ফল আনছিস কেন। কে খাবে?"

"আপনি খাবেন "

" এত ফল খাইয়ে একদিনে আমার শরীর ঠিক করার প্ল্যান করছিস নাকি?"

" একদিনে না পারি কিছুদিনেই ঠিক করে ফেলব ইনশাআল্লাহ।"

আবির সুস্থির কন্ঠে বলল,

"এত খেতে পারবো না। যেটুকু পারবো সেটুকুই খাবো৷ "

মেঘ মুচকি মুচকি হাসছে। মেঘের রহস্যময় হাসি দেখে আবির ভ্রু যুগল নাকের গুঁড়ায় টেনে রাশভারি কন্ঠে শুধালো,

"এভাবে হাসার কারণ কি? মনের ভেতর কি চলছে, হুমমমমম?"

মেঘের মুচকি হাসি প্রখর হলো। বেশকিছু সময় চলবো মেঘের অঁবাধ হাসি। আবির বিস্তীর্ণ আঁখিতে চেয়ে আছে তার কাদম্বিনীর দুটি নেত্রে। আজ কতদিন পর আবিরের প্রিয়তমার অকৃত্রিম হাসি দেখছে যাতে নেই কোনোরকম কৃপণতা। দীর্ঘ সময়ের হাসির নিমিত্তে মেঘের চোখ দুটা টলমল করছে। গাঢ় কমলা রঙের একটা জামার সাথে সাদার মধ্যে হ্যান্ডপ্রিন্টের একটা ওড়না মেঘের গায়ে জড়ানো। কমলা আর সাদার কম্বিনেশনে মেঘকে আজ অপরূপা লাগছে, সেই সাথে ঠোঁট গুলো আজ মাত্রাতিরিক্ত লাল দেখা যাচ্ছে, চোখের নিচে কাজল কিছুটা লেপ্টে আছে। নিরবধি হাসির কারণে ঘামে চিকচিক করছে নাকের ডগা। কোনো রমণীর প্রেমে পরার জন্য এরচেয়ে বড় কারণ বোধহয় আর হয় না। মুগ্ধতায় আবিরের দু চোখ আঁটকে আছে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে,বাস্তব আর কল্পনা গুলিয়ে যাচ্ছে। মেঘ চেষ্টা করেও নিজের হাসি থামাতে ব্যর্থ হচ্ছে । দিশাবিশা না পেয়ে বাধ্য হয়ে নিজের হাতে নিজের মুখ চেপে ধরে হাসি থামানোর চেষ্টা করলো। আবির তখনও নিরেট দৃষ্টিতে চেয়েই আছে। দৃষ্টির গভীরতা জুড়েই অবিশ্রান্ত ভালোবাসার সুবাস৷ মেঘের মোহমায়ায় জর্জরিত আবিরের হৃদয়।

মেঘ হাসি থামিয়ে আবিরের দিকে তাকাতেই আবির ভ্রু জোড়া নাচালো। মেঘ ঠোঁট বেঁকিয়ে মৃদুস্বরে বলল,

" আপনি এগুলো খাওয়া শুরু করুন। আমি আসছি।"

"কোথায় যাচ্ছিস?"

"আসতেছি এখনি।"

মেঘ কিছুক্ষণের মধ্যে দুটা প্লেট হাতে ফিরে আসলো। এক প্লেট ভর্তি ফল আরেক প্লেটে এক হালি সিদ্ধ ডিম। মেঘ ঠোঁটে হাসি রেখে প্লেট দুটা আবিরের সামনে রাখতেই আবির বিষম খেয়ে উঠল৷ কাশতে কাশতে আবিরের অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। অলরেডি আবিরের সামনে ১ হালি ডিম, এক প্লেট ভর্তি ফল, তারউপর মেঘ আরও এক হালি ডিম আর এক প্লেট ফল নিয়ে আসছে। আবির কাশতে কাশতে বলল,

" এইইই, এসবের মানে কি?"

মেঘ হেসে বলল,

"এই সবগুলো আপনি এখন খেয়ে শেষ করবেন। আর কোনো কথা আমি শুনতে চাই না। "

আবির বিপুল চোখে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘের যত্ন দেখে মনে হচ্ছে একদিনেই আবিরকে পুরোপুরি সুস্থ করে ফেলবে । শরীর থেকে যে পরিমাণ রক্ত বের হয়ছে তা একদিনেই পূরণ করে ছাড়বে। আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে একগ্লাস দুধ, একহালি ডিম আর এক প্লেট ফল কোনোরকমে খেয়ে শেষ করেছে। মেঘ সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে আবিরকে পরখ করছে। খাওয়াতে কোনো প্রকার গাফিলতি যেন না করতে পারে। আবির দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল,

"ম্যাম, আমি কি একটু রেস্ট নিতে পারবো?"

" বেশি কষ্ট হচ্ছে? "

"একটু তবে আপনি বললে শেষ করে ফেলব।"

"থাক, পরে খেয়ে নিয়েন৷ এখন আমি আসছি। "

আবির উদাসীন কন্ঠে বলল,

"আচ্ছা। "

আলী আহমদ খান বাসায় ফিরেই আবিরের থেকে নাম্বার নিয়ে গেছেন। মোজাম্মেল খান সহ বাকিদের সাথে কথা বলে অবশেষে মাহমুদা খানের নাম্বারে কল দিলেন৷মাহমুদা খানের ফোনে অলরেডি আলী আহমদ খানের নাম্বার ভাইজান লিখে সেইভ করা তাই চিনতে অসুবিধা হয় নি। কল দেয়ার পর প্রথমবারেই কল রিসিভ হলো।

মাহমুদা খান কন্ঠ খাদে নামিয়ে ধীর কন্ঠে বললেন,

"আসসালামু আলাইকুম ভাইজান।"

"ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছিস?"

"আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি কেমন আছ ?"

"আলহামদুলিল্লাহ। কোথায় আছিস?"

"বাসায়। আবির কেমন আছে?"

"আগের থেকে কিছুটা সুস্থ।"

"ভাবিরা কেমন আছে? বাকি সবাই কেমন আছে?"

"আলহামদুলিল্লাহ ভালো। যে কারণে তোকে ফোন দেয়া, আগামীকাল তোদের বাসার সবাইকে আমাদের বাসায় দাওয়াত। সবাইকে নিয়ে সকাল সকাল বাসায় চলে আসিস। আমার যেন দ্বিতীয় বার ফোন দিতে না হয়৷ "

"ঠিক আছে, ভাইজান।"

মাহমুদা খান ফোন রেখেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করেছেন, আইরিন আর আরিফ ও মায়ের সাথে সাথে কাঁদছে। জন্মের পর থেকে মা কে দেখে আসছে ভাইদের জন্য সবসময় কান্না করেন, ঈদ কিংবা কোনো উৎসব আসলেই তাদের মায়ের কান্না দেখতে হয়। ২৮ বছর পর খান বাড়িতে ঢুকার অনুমতি পেয়েছেন, সেই খুশিতে নিজের কান্না আটকে রাখতে পারছেন না। আলী আহমদ খানের রাগ এত সহজে কমে যাবে এটা কেউ কল্পনাও করতে পারে নি। আবিরও ভেবেছিল অন্ততপক্ষে ১-২ বছর চেষ্টা করলে হয়তো বা আব্বুর রাগ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিন্তু বোনকে প্রথম দেখাতেই ওনি সবাইকে ডেকে জানিয়ে দিবে এটা কেউ ই ভাবে নি।

আজ সকাল থেকে খান বাড়ির অন্দরমহলে কাজের ধুম পরেছে। দুজন হেল্পিং হ্যান্ড, বাড়ির তিন কর্তী সহ মেঘ, মীম আর আদিও কাজে ব্যস্ত। মেঘ কাজের ফাঁকে ফাঁকে আবিরকে দেখে আসে। আবিরের হাত অনেকেটায় ঠিক হয়েছে, তবে পায়ের ব্যথাটা এখনও অনেক বেশি। আজ তিনভাই একসঙ্গে বাজার করতে বেড়িয়েছেন৷ বোনের পছন্দ মতো মাছ থেকে শুরু করে সবজি, অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে আসছে। মীম, মেঘ মিলে চুপিচুপি একটা বরণডালাও সাজিয়েছে যেটা মীমের রুমে লুকিয়ে রেখেছে। আবির সুযোগ মতো মেঘকে ডেকে ঠান্ডা মাথায় সব বুঝিয়ে দিয়েছে, মেঘ যেন কোনো প্রকার উশৃংখল আচরণ না করে। আব্বু, চাচ্চুর প্রতি আবিরের বিন্দু পরিমাণ বিশ্বাস নেই, মেঘকে না আটকালে কখন কোন অঘটন ঘটবে তার আশঙ্কায় আছে। মেঘকে প্রটেক্ট করতে আজ আবিরও সামনে থাকতে পারবে না, তানভির কখন কোন কাজে ব্যস্ত থাকবে তাও বলা যায় না। যদি ফুপ্পির সাথে ফুপাকে দেখে আবিরের আব্বুর মাথা গরম হয়ে যায় তাহলেই সব ধ্বংস হয়ে যাবে। আবিরই বলেছিল ফুপ্পিকে বাসায় আনার কথা, কারণ এখন আবিরের অসুস্থতার কারণে আলী আহমদ খানের মন এমনিতেই খুব নরম, এমতাবস্থায় ফুপ্পিকে না আনতে পারলে পরবর্তীতে কবে সুযোগ পাবে তা জানা নেই।

প্রায় ১২ টার দিকে ফুপ্পিরা বাসায় আসছেন। মেঘ নিচ থেকে চিৎকার করে মীমকে ডাকছে। অথচ মীম রুমে সাজুগুজু করতে ব্যস্ত। মাহমুদা খান, ওনার হাসবেন্ড, আইরিন, আসিফ, জান্নাত সবাই এসেছে। আসিফ গতকাল ই দেশে ফিরেছে৷ আবিরদের সারপ্রাইজ দিবে ভেবেই কিছু জানায় নি। মীম বরণডালা নিয়ে আসছে না দেখে মেঘও ডাকাডাকি বন্ধ করে দিয়েছে। বাসায় ঢুকেই সবাই আবিরকে দেখার জন্য আবিরের রুমে চলে গেছে। মেঘ গ্লাস হাতে নিয়ে আবিরের রুমে যাচ্ছে এসময় মীম উপরের বেলকনিতে থেকে ডেকে জিজ্ঞেস করল,

"আপু ওনারা কোথায়?"

মেঘ রুষ্ট হয়ে বলল,

"ওনারা চলে আসছে। "

মেঘ আবিরের রুমে চলে গেছে। মীম কি বুঝলো কে জানে। দ্রুত রুমে চলে গেছে। সহসা একহাতে বরণডালা নিয়ে অন্যহাতে পা অব্দি ঢাকা লং ড্রেসের এক পাশ উঠিয়ে ছুটছে। মীমের পড়নে গাঢ় জলপাই রঙের একটা গাউন ড্রেস, একপাশে ওড়না সেফটিপিন দিয়ে আটকানো, স্ট্রেইট চুলগুলো কাঁধের নিচ পর্যন্ত পৌঁছেছে, মেঘ নিজেই মীমের চোখে আইলাইনার আর কাজল দিয়ে দিয়েছে,মীম ঠোঁটে রঞ্জকও লাগিয়েছে। মীমের একহাতে কালো ফিতার ঘড়ি, অন্য হাতে কতগুলো চুড়ি, এক পায়ে পায়েল সাথে পুতুলওয়ালা নরম তুলতুলে স্যান্ডেল পড়নে। এলোপাতাড়ি দৌড়ের কারণে মীমের কাঁধ ছাড়ানো চুলগুলো রীতিমতো লাফাচ্ছে। আশপাশ কোনোদিকে তাকানোর মতো সময় নেই। বরণডালা হাতে নিয়ে মেইনগেইট পার হতেই আচমকা একছেলের সাথে ধাক্কা লাগতেই সামনের ছেলেটা দ্রুত সরে গেছে। মীমের হাতের বরণডালা সহ ফুলের পাপড়ি সব পরে গেছে, সাথে সাথে মীমও ধপাস করে নিচে পরে গেছে। ব্যাথায় মীম চিৎকার করে উঠল,

"ও মা গো।"

চিকন লম্বা এক ছেলে দু কদম এগিয়ে এসে শুধালো,

"ব্যথা পেয়েছো?"

মীম রাগে কটকট করে বলল,

" এই কে আপনি, আমার বাসায় এসে আমাকে ফেলে দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করেন ব্যথা পাইছি কি না! আপনার সাহস তো কম না।"

আবারও আর্তনাদ করতে করতে বলল,

"উফফফ! আমি শেষ"

ছেলেটাও খেপা স্বরে বলল,

" নিজে দেখে চলতে পারো না আবার আমায় দোষারোপ করছো? আমি কি তোমায় ফেলছি নাকি? নিজের গায়ে জোর নাই আবার আমায় বলতে আসে।"

মীম এখনও মাটিতে পরে আছে।মীমের রাগ মাথায় উঠে যাচ্ছে, রাগে কটকট করতে করতে বলল,

"একদম গায়ের জোর নিয়ে কথা বলবেন না। আপনি ইচ্ছে করে আমায় ফেলছেন। আমি এখনি ভাইয়াকে ডাকবো।"

এমন সময় মেঘ আসছে। দরজার সামনে মীমকে বসে থাকতে দেখে মেঘ কপাল কুঁচকে শুধালো,

"কিরে তুই এখানে বসে আছিস কেন?"

মীম ফোঁস করে উঠল৷ গাল ফুলিয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে অভিযোগের স্বরে বলা শুরু করল,

"আমি এখানে শুধু শুধু বসে আছি না। এই ছেলে আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে। "

মেঘ ছেলের দিকে তাকাতেই ছেলেটা নিরুদ্বেগ কন্ঠে বলল,

"আপু বিশ্বাস করো, আমি ইচ্ছে করে ধাক্কা দেয় নি। ভেতর থেকে কে ছুটে আসছে আমি কিভাবে বুঝবো! আমি ভেতরে ঢুকছি সে হুট করে সামনে চলে আসছে, আমি ভয় পেয়ে কিছুটা সরে গেছি আর সে পরে গেছে। "

"নাহ আপু৷ ওনি ইচ্ছে করে ফেলছে। তুমি ভাইয়াকে এখনি ডাকো। এই ছেলের বিচার করতে হবে। উফফ আমার কোমর টা মনে হয় ভেঙেই গেছে। "

মেঘ মৃদু হেসে বলল,

"আরিফ, তুমি ভেতরে যাও।"

আরিফ ব্যস্ত কন্ঠে বলল,

"আপু সত্যিই আমি ইচ্ছে করে ফেলি নি।"

মেঘ তপ্ত স্বরে বিড়বিড় করে বলল,

"বুঝতে পেরেছি, তবে একটু সাবধানে থেকো। এসেই পাগলকে উস্কে দিয়েছো, এর পরিণাম কি হবে আমার জানা নেই। ভেতরে যাও।"

আরিফ ভেতরে চলে গেছে। মীম রাগান্বিত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,

"আপু ওনি ঐ ছেলেকে ভেতরে ঢুকতে দিলে কেন? ঐ ছেলে আমায় এত ব্যথা দিল তবুও তুমি তাকে ছেড়ে দিলে? তুমি আমার বোন হয়ে এটা করতে পারলে?"

মেঘ হাত বাড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

"মুখ টা বন্ধ করে ওঠ। কাজের কাজ কিছুই করতে পারিস না, তখন চিৎকার করে ডাকলাম, বরণডালা নিয়ে নামতে তুই নামিস নি। ওরা সবাই ভেতরে চলে গেছে এতক্ষণে তোর খবর হয়েছে। বরণ তো হলোই না বরং শুধু শুধু কোমড়ে ব্যথা টা পেয়েছিস। সাথে ড্রেস টাও নষ্ট করেছিস। "

মীম মেঘের হাত ধরে কোনো রকমে উঠলো। ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছে না। মেঘ মীমের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,

" পা টা শক্ত করে ঝাড়া দে, দেখবি ঠিক হয়ে গেছে।"

মেঘের কথা মতো মীম দুই তিনবার চেষ্টা করলো। কিছুটা ঠিক হওয়ার পর মেঘকে ধরে ধরে ভেতরে ঢুকলো। আবিরের রুমের দরজার সামনে আসতেই আকলিমা খান শুধালেন,

"কিরে কি হলো তোর?"

মীম রাগে বলতে নিল,

"এই ছে.."

মেঘ তাড়াতাড়ি মীমের মুখ চেপে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

"এমনি ব্যথা পেয়েছে।"

আকলিমা খান পুনরায় বললেন,

"সারাদিন উল্টাপাল্টা দৌড়াবে, ব্যথা তো পাবেই। বেশি ব্যথা পাইছিস?"

সিরিয়াস আলোচনায় মীমের ব্যথাটা আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে ফেলছে, আবিরও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তড়িঘড়ি করে বলল,

"আরে বেশি কিছু হয় নি। আমি এখনি ঔষধ দিয়ে দিচ্ছি। তোমরা কথা বলো।"

মেঘ মীমকে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেছে। আবিরের রুমে আলী আহমদ খান ব্যতীত আর সবাই উপস্থিত। আলী আহমদ খান নিজের রুমেই বসে আছেন। বোনের প্রতি ক্রোধ কিছুটা কমলেও, বোনের হাসবেন্ডকে তিনি এখনও মন থেকে মানতে পারছেন না। তাই সামনেই আসছেন না। মোজাম্মেল খান, মালিহা খান, হালিমা খান আলোচনা করে মাহমুদা খান আর ওনার হাসবেন্ডকে আলী আহমদ খানের রুমে পাঠাচ্ছেন ৷ ২৮-৩০ বছরের গড়ে ওঠা অদম্য অন্তরাল ভাঙতে মাহমুদা খান এবং ওনার হাসবেন্ড প্রয়োজনে আলী আহমদ খানের পায়ে ধরতেও রাজি।

■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■

#Ch.52 (শেষাংশ)

মেঘ মীমের সঙ্গে উপরে চলে গেছে। মীম কোমড়ের সাথে সাথে পায়েও অল্প ব্যথা পেয়েছে৷ আগে বুঝতে না পারলেও এখন মীমের পা জ্বলছে। কাটা স্থান থেকে রক্ত বেড়িয়ে পড়নের সেলোয়ারে দাগ হয়ে গেছে। মেঘ আগে ভেবেছিল সামান্য ব্যথা পেয়েছে তাই এত গুরুত্ব দেয় নি। মীমের অবস্থা দেখে এখন মেঘ নিজেই ভয় পেয়ে গেছে। বাসার কাউকে জানালে তুলকালাম কান্ড হয়ে যাবে। মীম পায়ের দিকে তাকিয়ে কাঁদছে আর আরিফকে অনর্গল বকেই যাচ্ছে। মেঘ বুঝিয়ে শুনিয়ে মীমকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। মেঘ কাটা স্থান জীবাণু মুক্ত করে একটা মলম লাগিয়ে ব্যথার ঔষধ খাইয়ে দিয়েছে। বেশকিছুক্ষণ বুঝানোর পর মীম কিছুটা শান্ত হয়েছে।মীম অন্য একটা ড্রেস পরেছে। কিছুক্ষণ পর দুইবোন একই সঙ্গে নিচে আসছে। পায়ে আর কোমড়ে ব্যথার জন্য মীম ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না৷ ওরা নিচে আসতেই দেখল আলী আহমদ খানের রুমের সামনে ভিড়, মেঘ মীমকে সোফায় বসিয়ে এগিয়ে গেল বড় আব্বুর রুমের দিকে। রুমের বাহিরে মোজাম্মেল খান, ইকবাল খান, মালিহা খান, হালিমা খান, আকলিমা খান দাঁড়িয়ে আছে। মেঘ আম্মু আর কাকিয়ার পাশ কেটে দরজা পর্যন্ত আসতেই মেঘের পা যুগল থমকে গেছে সেই সাথে হৃদস্পন্দনও হঠাৎ থেমে গেল। মাহমুদা খান এবং ওনার হাসবেন্ড দুজনে আলী আহমদ খানের দু পা আঁকড়ে ধরে অবিচ্ছেদ্য ভাবে কেঁদেই চলেছেন৷ ব্যগ্র স্বরে নিজের ভুল স্বীকার করছেন আর আলী আহমদ খানের কাছে মাফ চাচ্ছেন। আলী আহমদ খান বোনকে অনেকদিন আগেই ক্ষমা করে দিয়েছেন, তবে আজ বোনের হাসবেন্ড কে সামনাসামনি দেখার পর নিজেকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। পাথুরে মানবের ন্যায় আলী আহমদ খান বিছানার এক পাশে বসে আছেন৷ মোজাম্মেল খান ব্যতীত দরজার সামনে দাঁড়ানো প্রতিটা মানুষের চোখ টলমল করছে। মেঘ কাতর বদনে ফুপ্পির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, মেঘের বুকের ভেতর অসহনীয় যন্ত্রনা হচ্ছে, হৃদয় খুঁড়ে আসা আর্তনাদ গুলো অবিক্ষিপ্ত গতিতে দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পরছে। ক্ষণিকের জন্য মেঘ নিজেকে ফুপ্পির জায়গায় কল্পনা করতেই মেঘের চারপাশ অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। দাঁড়িয়ে থাকার সর্বশক্তি মুহুর্তেই বিলীন হয়ে গেছে। মেঘ দ্রুত স্থান ত্যাগ করলো। মীমের পাশে সোফায় গিয়ে বসে চোখ বন্ধ রেখে ঘনঘন শ্বাস নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। মেঘের অস্থিরতা দেখে মীম অবাক চোখে চাইলো। আশপাশে চোখ বুলিয়ে মীম সন্ধিহান কন্ঠে শুধালো,

"আপু কি হয়েছে তোমার? এভাবে হাঁপাচ্ছো কেন?"

মেঘ নিজেকে সামলে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

"কিছু হয় নি।"

অন্যদিকে আবিরের রুমে আসিফ, জান্নাত, তানভির, আরিফ, আইরিন সবাই খুনসুটিতে মেতে আছে। বেশকিছুক্ষণ খুশগল্প করার পর আসিফ হঠাৎ ই গম্ভীর কণ্ঠে আবিরকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"শুনলাম তুই নাকি মেঘের জন্য এক্সিডেন্ট করেছিস?"

"মোটেই না৷ তোমরা শুধু শুধু আমার ওনাকে দোষারোপ করছো। ওনার কোনো দোষ ই নাই। ভাগ্যে ছিল তাই এক্সিডেন্ট করেছি।

আসিফ কিঞ্চিৎ হেসে বললো,

" এখনি তার পক্ষ নিচ্ছিস? বিয়ের পর কি করবি তাহলে?"

আবির জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে, ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে মৃদুস্বরে বলল,

"পরে বউ ভক্ত জামাই হবো। ও যা বলবে, যেভাবে বলবে আমি সেভাবেই চলবো। বাস্তবে কেন, স্বপ্নেও কোনোদিন ওকে আমার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযোগ তুলতে দিব না৷ ইনশাআল্লাহ। "

জান্নাত, আসিফ আর তানভির একসঙ্গে "ইনশাআল্লাহ" বলে উঠল।

আইরিন হাসিমুখে শুধালো,

"ভাইয়া তুমি বিয়েটা কবে করবা? আমরা কি বিয়ে খাবো না?"

আবির ঠাট্টার স্বরে বলল,

"তোকে বিয়ে দিয়ে তারপর ই করবো।"

আইরিন মুখ ফুলিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

"আমার কি বিয়ের বয়স হয়ছে? মাত্র ১৬ বছর বয়স আমার। আমি এখনও শিশু।"

তানভির হেসে বলল,

" এখনও কত কত গ্রামে ১২-১৪ বছর বয়সী মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। সেখানে তুই তো তাদের থেকে ২ বছরের বড়৷ তোকে দিতে সমস্যা কি?"

আইরিন গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে বলল,

"তোমার বোন যে আমার থেকে আরও ৩ বছরের বড় সে বেলায়? তাকে বিয়ে দাও না কেন?"

তানভির সত্বর জবাব দিল,

"আমার বোনের জামাই ফিক্সড তাই কোনো টেনশন নাই কিন্তু তোর জন্য তো ছেলে খোঁজতে হবে এজন্য সবার টেনশন। "

আইরিন ভ্রু নাকের গুঁড়ায় টেনে রাশভারি কন্ঠে বলল,

"আমি বিয়েই করবো না। "

আইরিনের কথা শুনে সবাই উঁচু স্বরে হাসতে শুরু করেছে। আইরিন রাগে কটকট করতে করতে সবার দিকে তাকাচ্ছে। জান্নাত ঠোঁটে হাসি রেখেই বলল,

" তোমরা সবসময় আমার ননদিনী টাকে রাগাও। আমার ননদিনীকে বিয়েই দিব না, সারাজীবন আমাদের কাছে রেখে দিব। তাহলে আম্মুকেও মেয়ের জন্য কান্নাকাটি করতে হবে না। "

আইরিনের গাল ফুলানো দেখে আরিফ আইরিনের মাথায় গাট্টা মেরে বলল,

"তুই এত বেক্কল কেন রে? মজাও বুঝিস না?"

আইরিন মাথায় ঘষতে ঘষতে অসহায় মুখ করে আরিফের দিকে চেয়ে আছে। আরিফ সবার সাথে অন্য বিষয়ে কথা বলায় ব্যস্ত । এরমধ্যে আকলিমা খান দরজা থেকে ডেকে বললেন,

"তানভির, ওদের নিয়ে বাসা টা একটু ঘুরে দেখা। আর পারলে আবিরকে ধরে রুমটা থেকে বের কর। এক রুমে বন্দি থাকতে কত ভালো লাগে?"

তানভির ধীর কন্ঠে বলল,

" ঠিক আছে।তুমি যাও, আমি ভাইয়াকে নিয়ে যাচ্ছি। "

আইরিন, আরিফ, জান্নাত আগে বেড়িয়ে গেছে।তানভির আর আসিফ দুপাশ থেকে আবিরকে ধরে আস্তেধীরে নিয়ে যাচ্ছে। আবিরের হাত মোটামুটি ঠিক হয়ে গেছে, পায়ে ব্যথা রয়েছে। বাড়ির নিরিবিলি পরিবেশ দেখে জান্নাত এগিয়ে গিয়ে আকলিমা খানকে শ্বাশুড়ির কথা জিজ্ঞেস করতে লাগলো। মেঘ আর মীম দু'জন ই সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে। সবাইকে বের হতে দেখে হালিমা খান এগিয়ে এসে মেঘকে ডেকে বললেন,

"ওদের নিয়ে ছাদ থেকে ঘুরে আয়। আমরা খাবার রেডি করছি।"

এদিকে ওদিক নজর বুলিয়ে মেঘ উঠে নিজের মনকে সামলে মুখে হাসি নিয়ে বলল,

"চলো।"

মীমকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"কিরে তুই যেতে পারবি ?"

মীম মেঘের দিকে এক পলকের জন্য তাকাতেই হঠাৎ আরিফের দিকে চোখ পরলো। ওমনি মীম রেগেমেগে আগুন হয়ে গেছে। রাগান্বিত কন্ঠে বলল,

"আমি যাব না। তুমি যাদের নিয়ে যাচ্ছিলে তাদের নিয়েই যাও।"

মেঘ যথারীতি আইরিন আর আরিফকে নিয়ে উপরে চলে গেছে। এক এক করে মীম,তানভির, মেঘ, আবির সবার রুম ঘুরিয়ে ছাদে নিয়ে গেল। ছাদ ভর্তি এত এত গাছ দেখে আইরিন খুশিতে লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে। আইরিনের উইশলিস্টের প্রায় অনেক গাছ অলরেডি মেঘদের ছাদে আছে। আইরিন আপন মনে বকবক করেই যাচ্ছে,

"এই গাছটা আমার আছে, ঐটা ছিল এখন নাই, এই গাছটা আমাদের বাসায় হয় না। তুমি আবার আমাদের বাসায় গেলে তোমাকে আমাদের বাসার ছাদে নিয়ে যাব। "

মেঘ মৃদু হেসে শুধু বলল,

" আচ্ছা ঠিক আছে। "

অনেকক্ষণ যাবৎ বকবক সহ্য করে অবশেষে আরিফ ক্ষুদ্ধ হয়ে বলল,

"তোদের সাথে এসে আমার নিজেকে উন্মাদ মনে হচ্ছে। গাছগাছালি নিয়ে এত আলোচনা গবেষণাগারের গবেষকরাও বোধহয় করেন না। "

আইরিন ঠাট্টার স্বরে বলল,

"তুই ভালো মানুষ ছিলি কবে?"

আরিফ অগ্নি দৃষ্টিতে তাকাতেই আইরিন ভেঙচি কাটলো। মেঘ হেসে বলল,

"আচ্ছা গাছ নিয়ে আর কথা বলব না। তোমার যে বিষয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করে সেই বিষয়েই বলো।"

 আরিফের রাগ মুহুর্তেই গায়ের হয়ে গেছে। সহসা অস্ফুট কন্ঠে বলল,

"এই না হলে আমার ভা.."

আইরিন সঙ্গে সঙ্গে আরিফের মুখ চেপে ধরে ফেলল। মেঘ আশ্চর্যান্বিত নয়নে তাকিয়ে আইরিনকে শুধালো,

"আরিফের মুখ চেপে ধরেছো কেন?"

পুনরায় আরিফকে শুধালো,

"কি বলতে চাইছিলে বলো, ভা মানে কি?"

আরিফ ঢোক গিলে উষ্ণ স্বরে বলল,

"ভালো বোন।"

মেঘ ভ্রু কুঁচকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধালো,

"সত্যি? তাহলে আইরিন মুখ চেপে ধরেছে কেন?"

"আইরিন খুব হিংসুটে, ও নিজেকে

ছাড়া আর কাউকে ভালো বলতে দিবে না। তোমাকে ভালো বলে ফেলছি এটা ওর সহ্য হচ্ছে না। "

আইরিন বিপুল চোখে আরিফের দিকে তাকিয়ে আছে আর ভেতরে ভেতরে ফুঁসতেছে। বিড়বিড় করে বলল,

"আগে বাসায় চল, তারপর তোকে বুঝাবো।"

মেঘ, আইরিন, আরিফ তাদের পড়াশোনা, ভার্সিটি লাইফ আর স্কুল লাইফ নিয়ে গল্প করছে। এদিকে আবির, তানভির, আসিফ সোফায় বসে বসে গল্প করছে। আবিরের ব্যবসা, তানভিরের রাজনীতি, আসিফের জব লাইফ নিয়েই নানান আলাপ আলোচনায় মগ্ন। জান্নাত, হালিমা খান ও আকলিমা খানের সাথে খাবার পরিবেশনে সাহায্য করছে৷ মাহমুদা খান, ওনার হাসবেন্ড এবং বাকিরা আলী আহমদ খানের রুমেই টুকটাক কথা বলছেন। মাহমুদা খানকে আলী আহমদ খান নতুন করে সবার পরিচয় দিচ্ছেন, যদিও মাহমুদা খান সবাইকে আগে থেকে চিনেন। আলী আহমদ খান হঠাৎ প্রশ্ন করলেন,

"তোর ছেলে মেয়ে কি তিনজন ই?"

মাহমুদা খান মৃদুস্বরে বললেন,

"নাহ। আমার আলহামদুলিল্লাহ দুই ছেলে আর দুই মেয়ে।"

মোজাম্মেল খান শুধালেন,

"আরেক মেয়ে কোথায়? নিয়ে আসলি না কেনো?"

"বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে,কানাডা থাকে।"

ইকবাল খান আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে বললেন,

"আফা, তোমার এক মেয়েকেও বিয়ে দিয়ে ফেলছো? "

মাহমুদা খান মলিন হেসে বললেন,

"আলহামদুলিল্লাহ একবছরের একজন নাতিও আছে। "

মোজাম্মেল খান বোনের কথায় রীতিমতো ভীমড়ি খেলো। আলী আহমদ খান মালিহা খানের দিকে তাকিয়ে উদাসীন কন্ঠে শুধালেন,

" আমার ছেলেকে এবার বিয়ে করানো দরকার। নাকি বলো?"

মালিহা খান কিছুটা তপ্ত স্বরে বললেন,

"আবির ফেরার পর থেকে আপনার কাছে আমি এই কথা বলছি। কিন্তু আপনি তো আমার কথা গুরুত্বই দিচ্ছেন না। "

"এবার গুরুত্ব দিতেই হচ্ছে। আমার ছোট বোন নানি হয়ে গেছে আর আমি এখনও ছেলের বউ এর মুখে আব্বাজান ডাক ই শুনতে পারলাম না।"

মোজাম্মেল খান চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

" কোনো মেয়ে কি পছন্দ হয়েছে ভাইজান? দেখেছো কি?"

"হ্যাঁ। মেয়ে আমার পছন্দ করায় আছে। আবির শুধু হ্যাঁ বললেই হবে৷ "

মালিহা খান উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালেন,

"মেয়ে কে? কি করে?"

আলী আহমদ খান ঠাট্টার স্বরে বললেন,

"মেয়ে তুমিও দেখেছিলে এবার আমিও দেখেছি। এখন দেখি ছেলে কি করে। "

মোজাম্মেল খান আবারও প্রশ্ন করলেন,

"ভাইজান, তুমি কি শাকিল সাহেবের মেয়ের কথা ভাবতেছো?"

মালিহা খান জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,

"শাকিল সাহেব কে?"

ইকবাল খান উত্তর দিলেন,

"ভাইজানের ব্যবসায়িক বন্ধু।"

"মেয়ে দেখতে কেমন?"

"মাশাআল্লাহ ভাবি। মেয়ে দেখার মতো। আপনি দেখলে চোখ ফেরাতে পারবেন না যাকে বলে আগুন সুন্দরী। তারউপর বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে বলে কথা। "

মালিহা খান ঠান্ডা কন্ঠে জানালেন,

"নাহ। আমার ছেলের বউ হবে আমাদের মতো সাধারণ, অবশ্যই মিশুক হতে হবে। যে আগুনের আশেপাশে ভিড়তেই পারবো না সে আগুনে আমার ছেলেকে পুড়তে দিব না। "

আলী আহমদ খান গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

"তোমার ছেলে বিয়ের জন্য রাজি হলে তারপর অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাবে। "

এদিকে মাহমুদা খানের বুকের ভেতর থাকা হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠেছে। ওনি এতদিনে আবিরকে যতটুকু চিনেছেন, আবির মেঘকে না পেলে আবিরও বাঁ-চবে না। যেকোনো একটা বড় ধরনের এক্সিডেন্ট ঘটিয়ে ফেলবে। মাহমুদা খান আলী আহমদ খানের সামনে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছেন না, আবার চুপচাপ কথাগুলো হজমও করতে পারছেন না।

অন্যদিকে মীম সোফায় বসে ছিল, আবির রা সােফায় এসে বসতেই, মীম কিছু একটা ভেবে তড়িঘড়ি করে উঠে পায়ে ব্যথা নিয়েই দৌড়ে রান্নাঘরে গেল। উত্তেজিত কন্ঠে শুধালো,

"আম্মু, বাসায় কলা আছে?"

"হ্যাঁ৷ কেনো?"

"আমায় একটা কলা দাও। "

" ভাত খাওয়ার সময় কলা দিয়ে কি করবি?"

"খাবো৷ এখনি দাও। একটা না দুটা কলা দিও "

আকলিমা খান কপাল কুঁচকে মীমের দিকে তাকিয়ে কিছু না বলে দুটা কলা বের করে দিল। সঙ্গে সঙ্গে হালিমা খান মীমকে বললেন,

" মীম, ছাদ থেকে ওদের ডেকে নিয়ে আয় তো মা।"

মীম ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে বলল,

"অবশ্যই । এখনি যাচ্ছি।"

মীম কলা খেতে খেতে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। মুহুর্তেই যেন পায়ের ব্যথার কথা সম্পূর্ণ ভুলে গেছে। ছাদের দরজা থেকে ডাকলো,

"আপু, মামনি তোমাদের ডাকছে। "

মেঘ স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

"আচ্ছা যাচ্ছি। কিন্তু তুই এখানে আসলি কিভাবে?"

"এভাবেই৷ "

মেঘ আর আইরিন গল্প করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নামছে৷ আরিফ মীমের শারীরিক অবস্থা বুঝার জন্য এক পলক মীমের দিকে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিয়েছে। মীম যদি বুঝতে পারে আরিফ ইচ্ছেকৃত মীমের দিকে তাকিয়েছে তাহলে এবার সিডর, আইলার মতো তান্ডব শুরু করে দিবে। আরিফ ফোনের দিকে মনোযোগ দিয়ে মীমকে পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। আরিফ ৪-৫ সিঁড়ি নামতেই হঠাৎ স্লিপ কেটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কয়েক সিঁড়ি নেমে সামনে থাকা আইরিনের দু কাঁধে ধরার চেষ্টা করে।আরিফের ভর আইরিন নিতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়তে নেয়, মেঘ তাড়াতাড়ি আইরিনকে ধরে ফেলে, ততক্ষণে আরিফ ও নিজের শক্তি দিয়ে কোনোরকমে স্থির হয়েছে। পায়ের ২-৩ জায়গায় ঘষা খাওয়ায় আরিফের পা জ্বলছে, সেদিকে না তাকিয়ে আরিফ পেছন ফিরে তাকাতেই দেখল একটা সিঁড়িতে কলার বাকল অক্ষত অবস্থায় পরে আছে, এর আগের সিঁড়িটাতেই আরিফের পা পরেছিল। মীম দুটা কলা খেয়ে পরপর দুই সিঁড়িতে বাকল ফেলেছে, যেন যেকোনো একটাতে আরিফ স্লিপ খায়। মেঘ আর আইরিন আগে নেমে যাওয়ায় এবং আরিফের মনোযোগ ফোনে থাকায় মীমের কাজে বেশ সুবিধা হয়েছে। আরিফ চোখ তুলে মীমের দিকে তাকাতেই মীম নিজের দুহাত ঝেড়ে এমন ভাব নিলো যেন সে বিশাল কিছু করে ফেলেছে। আরিফের রাগ হলেও সে প্রকাশ করল না, আইরিন নিজের মতো করে আরিফকে বকছে, আইরিন ভেবেছে আরিফ ইচ্ছে করে আইরিনকে ধাক্কা দিয়েছে। আরিফ সেসবে পাত্তা না দিয়ে মেঘদের পাশ কাটিয়ে নিচে চলে গেছে। মীম নেমে এসে উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,

"আইরিন আপু, তুমি কি ব্যথা পেয়েছো?"

মেঘ সন্দেহের দৃষ্টিতে মীমকে দেখেও কিছু বললো না।

..................................................................

𝐓𝐎 𝐁𝐄 𝐂𝐎𝐍𝐓𝐈𝐍𝐔𝐄𝐃

Episodes
1 List of stories...
2
3 সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.1]
4 সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.2]
5 সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.3]
6 সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.4]
7 সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.5]
8 সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.6]
9 সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.7]
10 সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.8]
11 সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.9]
12 সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.10]
13 সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.11]
14 সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.12]
15 সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.13]
16 সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.14]
17 সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.15]
18
19 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.1]
20 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.2]
21 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.3]
22 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.4]
23 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.5]
24 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.6]
25 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.7]
26 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.8]
27 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.9]
28 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.10]
29 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.11]
30 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.12]
31 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.13]
32 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.14]
33 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.15]
34 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.16]
35 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.17]
36 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.18]
37 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.19]
38 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.20]
39 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.21]
40 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.22]
41 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.23]
42
43 এক সমুদ্র প্রেম [Part.1]
44 এক সমুদ্র প্রেম [Part.2]
45 এক সমুদ্র প্রেম [Part.3]
46 এক সমুদ্র প্রেম [Part.4]
47 এক সমুদ্র প্রেম [Part.5]
48 এক সমুদ্র প্রেম [Part.6]
49 এক সমুদ্র প্রেম [Part.7]
50 এক সমুদ্র প্রেম [Part.8]
51 এক সমুদ্র প্রেম [Part.9]
52 এক সমুদ্র প্রেম [Part.10]
53 এক সমুদ্র প্রেম [Part.11]
54 এক সমুদ্র প্রেম [Part.12]
55 এক সমুদ্র প্রেম [Part.13]
56 এক সমুদ্র প্রেম [Part.14]
57 এক সমুদ্র প্রেম [Part.15]
58 এক সমুদ্র প্রেম [Part.16]
59 এক সমুদ্র প্রেম [Part.17]
60 এক সমুদ্র প্রেম [Part.18]
61
62 ইট পাটকেল [Part.1]
Episodes

Updated 62 Episodes

1
List of stories...
2
3
সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.1]
4
সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.2]
5
সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.3]
6
সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.4]
7
সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.5]
8
সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.6]
9
সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.7]
10
সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.8]
11
সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.9]
12
সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.10]
13
সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.11]
14
সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.12]
15
সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.13]
16
সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.14]
17
সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি [Part.15]
18
19
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.1]
20
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.2]
21
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.3]
22
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.4]
23
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.5]
24
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.6]
25
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.7]
26
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.8]
27
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.9]
28
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.10]
29
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.11]
30
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.12]
31
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.13]
32
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.14]
33
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.15]
34
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.16]
35
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.17]
36
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.18]
37
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.19]
38
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.20]
39
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.21]
40
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.22]
41
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে [Part.23]
42
43
এক সমুদ্র প্রেম [Part.1]
44
এক সমুদ্র প্রেম [Part.2]
45
এক সমুদ্র প্রেম [Part.3]
46
এক সমুদ্র প্রেম [Part.4]
47
এক সমুদ্র প্রেম [Part.5]
48
এক সমুদ্র প্রেম [Part.6]
49
এক সমুদ্র প্রেম [Part.7]
50
এক সমুদ্র প্রেম [Part.8]
51
এক সমুদ্র প্রেম [Part.9]
52
এক সমুদ্র প্রেম [Part.10]
53
এক সমুদ্র প্রেম [Part.11]
54
এক সমুদ্র প্রেম [Part.12]
55
এক সমুদ্র প্রেম [Part.13]
56
এক সমুদ্র প্রেম [Part.14]
57
এক সমুদ্র প্রেম [Part.15]
58
এক সমুদ্র প্রেম [Part.16]
59
এক সমুদ্র প্রেম [Part.17]
60
এক সমুদ্র প্রেম [Part.18]
61
62
ইট পাটকেল [Part.1]

Download

Like this story? Download the app to keep your reading history.
Download

Bonus

New users downloading the APP can read 10 episodes for free

Receive
NovelToon
Step Into A Different WORLD!
Download MangaToon APP on App Store and Google Play